শাকিবসর্বস্ব ‘রকস্টার’
‘রকস্টার‘ শাকিব খানের পরিবর্তনশীল ইমেজের ছবি। তার ক্যারিয়ারেে বেশকিছু ছবির মধ্যে অনেকাংশেই নিজের ডমিনেটিং বিষয়টা বেশি দেখা যায় যেখানে ছবিগুলো শাকিবসর্বস্ব হয়ে ওঠে, পরিচালকের নিজের কাজ দেখানোর যে বিষয় সেটা কম ফুটে ওঠে। ‘রকস্টার’ ঠিক এ জায়গাটিতে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে শাকিব খানের পারফরম্যান্সই ছবির প্রাণ হয়ে উঠেছে এর বাইরে যেন বিশেষ কিছু দেখার নেই।

এই ডমিনেটিং যে ‘aura’ তাতে করে একজন নায়কেরই শুধু দেখানোর অনেককিছু থাকে কিন্তু যে ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ সেই পরিচালকের তেমন কিছু দেখানোর থাকে না বা তিনি দেখাতে ব্যর্থ হন যেটি সচেতন দর্শকশ্রেণির কাছে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। কারণ তারা শুধুমাত্র নায়ককে দেখার জন্য ছবি দেখতে যায় না, তারা ছবি দেখে ছবিটি নায়কসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়সহ কমপ্লিটলি ছবি হয়ে উঠেছে কিনা। ‘রকস্টার’ এ জায়গাটিতে মিসিং পজিশনে আছে।
শাকিব খান সাম্প্রতিক সময়ে যে ছবিগুলোতে নিজেকে কিছুটা হলেও ভিন্নভাবে এনেছে তার মধ্যে ‘রাজকুমার’-এর শান্ত একটি চরিত্র যাকে শেষ দৃশ্যে দুর্দান্ত অভিনয়ে দেখা গেছে। ‘তাণ্ডব’-এ অ্যাকশন থাকার পরেও ভয়েস কন্ট্রোলের মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের সমস্যা তুলে ধরার মতো সিরিয়াস ক্যারেক্টারে অভিনয় করেছিল। এই ছবিগুলোতে শাকিব খানের নিজের চরিত্রের ভ্যালু থাকার পাশাপাশি পরিচালকের নিজের কৃতিত্বও দেখার মতো কারণ চিত্রনাট্যে দম ছিল কিন্তু ‘রকস্টার’-এ শুধু লুক পরিবর্তন ছাড়া পরিচালকের আর কোনো কৃতিত্ব নেই।

পরিচালক আজমান রুশো-র ভাষ্যমতে (সাক্ষাৎকার থেকে) একজন রকস্টারের জীবনের আপস এন্ড ডাউনস নিয়ে তিনি ছবিটি নির্মাণ করেছেন, পৃথিবীর যাবতীয় রকস্টারের জীবনে এটা কমন। তাঁর কথা আমরা যৌক্তিক মনে করি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন রকস্টারের জীবনেও সেটা থাকবে। শাকিব খানের পার্সোনাল রুমে বব মার্লের ছবি শোভা পাচ্ছিল, শাকিব খান কি তার মতো হতে চেয়েছে ছবিতে? সেই চেষ্টা তার মধ্যে দেখা যায় না। শাকিবকে টিপিক্যাল ওয়েতে স্টেজ পারফরম্যান্স, নেশা, প্রেম বা নারীসঙ্গ, স্টারডম ক্যারি করা, ডাউনফলের আয়োজন এভাবেই দেখানো হয়েছে। আমাদের প্রেক্ষাপটে এগুলোর বাইরে আর কিছুই দেখানোর নেই কি? শাকিব খানের লুকের মধ্যে কিছু ভেরিয়েশন ছিল সেটা যেমন দৃষ্টি কেড়েছে, তার ক্যারেক্টারাইজেশনের ভেরিয়েশন নেই সেটা আবার দৃষ্টিকটুও হয়েছে। একজন নায়ককে পরিবর্তনশীল ইমেজে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তুলে ধরার পরে ছবির চিত্রনাট্যে শক্তি না থাকাটাই ‘রকস্টার’-কে সমালোচনা বা মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ফেলেছে।
সঙ্গতভাবেই শাকিব খানের পরে সাবিলা নূরই ছবির দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র যার অভিনয়ের জায়গা যথেষ্ট ছিল এবং সাবিলা বেশ ভালোভাবেই তা ক্যারি করতে পেরেছে। শেষ পর্যন্ত তার চরিত্রের প্রভাব শাকিবের উপর ছিল। তানজিনা মিথিলা গ্ল্যামারাস বাদবাকি চরিত্রগুলোর মধ্যে তারিক আনাম ও রোজী সিদ্দিকীর কিছুটা গুরুত্ব ছিল।
এখন আর কি কি থাকলে ‘রকস্টার’-এর চিত্রনাট্য শক্তিশালী হত? যদি রকস্টার তৈরির প্রেক্ষাপট আমাদের উপমহাদেশের মাধ্যমে কিভাবে হয় সেরকম কোনো কিছু গল্পে থাকত, পারিপার্শ্বিক কোন কোন বাস্তবতায় একজন রকস্টারের জীবনে সঙ্গীত প্রভাব ফেলত এরকম কিছু দেখানো হত, শাকিব খানের লিপে কোন সিঙ্গারকে রকস্টারের সাথে সবচেয়ে মানানসই লাগত সেটা আরো স্টাডি করা যেত যেহেতু মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে স্টেজ সং-এ, শাকিব খানের অভিনয়ে আর কেমন অ্যাটিটিউড আনা হলে রকস্টারের প্রকৃত অ্যাটিটিউড পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠত সেটা ভাবা হত, শাকিবকে দেখে পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে রকস্টার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে সেরকম কিছু থাকতে পারত গল্পে।

মিউজিক্যাল ফিল্মে যেটা হয় গানে গানে ছবিতে স্টোরি টেলিং চলে। গানই এ ধরনের ছবির প্রাণ। এ ছবিতে গানের ভূমিকা সে জায়গায় যেতে পারেনি। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-ও ওয়ান কাইন্ড অফ মিউজিক্যাল মুভি কারণ গানে গানে ছবির স্টোরি টেলিং হয় ফোক আবহে, ‘ভাইবন্ধু’-র মতো ছবিও একইভাবে এগিয়েছে। ‘রকস্টার’-এ সেরকম কিছু ঘটেনি। এখানে গানগুলো একেকটা একেকরকম। তবে গানের মধ্যে আধুনিকতার যে বিষয়টি আছে সে অনুযায়ী শাকিব খানের ক্যারিয়ারে সম্পূর্ণ নতুন কিছু ঘটেছে। ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’ গানটি রক ভার্সনে সেরা যদিও শাকিবের রকস্টার ইমেজের অভিনয় কতটুকু ফুটে উঠেছে সেটা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ‘মায়া’ গানটি ভিন্নরকম আর রোমান্টিক আবহে ‘আমি যাবো হারিয়ে’ মেলোডিয়াস ছিল। এছাড়া স্যাড ভার্সনে দুটি গান ভালো ছিল।
তো সব মিলিয়ে সামারাইজ করলে শাকিবসর্বস্ব ‘রকস্টার’ ছবি পরিচালকের দিক থেকে বিশেষত্বপূর্ণ হতে পারেনি।
রেটিং – ৬.৫/১০






