রকস্টারে নতুনত্ব আছে, তবে…
আগুন একজন উঠতি মিউজিশিয়ান। সে তার ফেমাস বাবার ছত্রছায়ায় থেকে নাম করতে চায় না। অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই আগুনের উত্থান ঘটে এবং ধীরে ধীরে সে ইউথ জেনারেশনের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় আগুনের জীবনে আসে মিরা। সবকিছু যখন ভালোই চলছিল, ঠিক তখনই বিশাল এক ডাউনফলের মুখোমুখি হয় আগুন। কীভাবে? সেই উত্তর মিলবে আজমান রুশো পরিচালিত এবং শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’ সিনেমায়।

স্টোরিলাইন শুনে হয়তো মনে হতে পারে, এখানে একজন রকস্টারের উত্থান-পতনকে ঘিরেই গল্প এগোবে। তবে এই সিনেমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা পুরোপুরি খাটেনি। চিত্রনাট্যের বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে রোম্যান্টিক ড্রামা। ফলে, মিউজিক্যাল ড্রামা দেখার এক্সপেকটেশন নিয়ে গেলে সিনেমাটি কিছুটা হতাশ করতে পারে (অথবা মেশিন গান দেখার প্রত্যাশা নিয়ে গেলেও)। তো সিনেমায় শাকিব খানের এন্ট্রি সিক্যুয়েন্সটা ভালো ছিল। আগুনের কাকতালীয় উত্থানের পর মিরার সঙ্গে আগুনের দেখা হওয়া এবং প্রেমে জড়িয়ে পড়ার মুহূর্তগুলো বেশ মিষ্টি লেগেছে। এই অংশে ‘হাওয়া’ সিনেমাকে ট্রিবিউট দেওয়ার আইডিয়াটাও ভালো, যদিও সেটি খুব একটা ইফেক্টিভ হয়নি। পরিচালক রুশো আগুন-মিরার লাভ ট্র্যাককে আরও কিছু সুন্দর মোমেন্ট দিয়ে বিল্ড করার চেষ্টা করেছেন। তবে সেই লাভ ট্র্যাকের পাশে আগুনের মিউজিক্যাল জার্নিটা গল্প খুব অল্প জায়গাই পেয়েছে। সেটাকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারলে হয়তো সিনেমার নামটাও আরও বেশি সার্থকতা পেতো।
যাইহোক, ইন্টারভেলের কিছুটা আগে গল্প ভিন্ন দিকে মোড় নেয়, যদিও তখনও সেটা লাভ ট্র্যাকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, সেকেন্ড হাফে গিয়ে চিত্রনাট্য ধীরগতির হয়ে পড়ে। ফার্স্টহাফে মিউজিক্যাল জার্নিটা ভালোভাবে প্রেজেন্ট না করা হলেও, অন্তত দ্বিতীয়ার্ধে রকস্টারের স্টারডমকে ভালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল নির্মাতার হাতে। কিন্তু সেটাকে মাত্র একটি গানের মাধ্যমে ক্লোজার দেওয়ার বিষয়টি চোখে লেগেছে। যদিও গানটি স্টোরিটেলিংয়ে ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে, ইমোশনটা ঠিকভাবে ফিল করার মতো মোমেন্ট তৈরি হয়নি।

এরপর গল্পে আগুনের চরিত্রে নতুন কিছু শেইড আসতে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, সেগুলো পর্দায় খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনা। পাশাপাশি গল্পে নতুন একটি চরিত্র যুক্ত হয়। চরিত্রটি হেভিওয়েট ডায়লগ থ্রো করলেও, সেটার চেয়ে তার খোলা পিঠই যেন বেশি সাড়া ফেলেছে (অন্তত সিঙ্গেল স্ক্রিনের দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখে তাই মনে হয়েছে)। তবে এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ন দেখতে পাওয়া যায়, যেটা প্রয়োজন ছিল। গল্প তখন একটা স্যাটিসফাইং নোটে এগোতে থাকে। আর ওই জায়গাতেই শেষ হলে বোধহয় ভালো হতো। ক্লাইম্যাক্সে শক ভ্যালু যোগ করতে গিয়ে শেষ অংশটা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে বলতেই হয়—যারা সিনেমার শেষটা না দেখেই হল থেকে বেরিয়ে গেছেন, তারাই হয়তো ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অভিনয়ে শাকিব খান দুর্দান্ত ছিলেন। পুরো সিনেমাজুড়ে তাকে অনেক বেশি স্টাইলিশভাবে প্রেজেন্ট করা হয়েছে। এর ফলে পর্দায় একপ্রকার চার্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি একটি জায়গায় তার ভয়েস মডুলেশনও নজর কাড়ে। ‘তাণ্ডব’-এ যদিও এই ব্যাপারটি দীর্ঘ সময় ধরে ছিল, তারপরও ‘রকস্টার’-এ তার ভয়েস মডুলেশন প্রশংসার দাবিদার। শাকিব খানের পর সবচেয়ে স্ট্রং পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন সাবিলা নূর। তিনি ভীষণই পরিমিত অভিনয় করেছেন। শাকিব খান ও সাবিলা নূরের কেমিস্ট্রিও বেশ ভালো ছিল। ছোট একটি চরিত্রে তানজিয়া জামান মিথিলার উপস্থিতি গ্ল্যামারাস হলেও খুব একটা মনে রাখার মতো নয়। বরং কম স্ক্রিনটাইম পেয়েও রোজী সিদ্দিকী ভালো পারফর্ম করেছেন। সুনিধি নায়েককে নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, কারণ তার উপস্থিতি মূলত টিজারে দেখানো সিক্যুয়েন্সগুলো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এছাড়া তারিক আনাম খান ও কাজী সাবির নিজেদের জায়গা থেকে ভালো কাজ করেছেন।
সিনেমাটিতে মোট ১০টি গান রয়েছে। যেহেতু এটি একটি মিউজিক্যাল ফিল্ম, তাই এত গান থাকা অস্বাভাবিক নয়। বেশিরভাগ গানই গেয়েছেন আহমেদ হাসান সানি। তার কণ্ঠ সুন্দর হলেও, শাকিব খানের সঙ্গে খুব একটা মানানসই লাগেনি। সে তুলনায় অঙ্কন কুমারের কণ্ঠে “আমি যাবো হারিয়ে” গানটি বেশি ভালো লেগেছে, যেখানে শাকিব খানকে লিপসিঙ্ক করতে হয়নি। এছাড়া “আমরা হয়তো” গানটির প্লেসমেন্ট যেমন ভালো ছিল, তেমনই গানটি ইমোশনালিও হিট করেছে—অবশ্য এটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দেরও একটি গান। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কাজও বেশ ভালো ছিল।

টেকনিক্যালি ‘রকস্টার’ একটি রিচ সিনেমা। আব্দুল মামুনের সিনেমাটোগ্রাফি যেন এই সিনেমার প্রাণ। প্রতিটি ফ্রেম ভীষণ সুন্দর, কালার গ্রেডিং বেশ ভালো। তবে এডিটিং আরও স্মুথ হতে পারতো। কিছু কিছু ট্রানজিশন ঠিক স্বাভাবিক লাগেনি, আবার কিছু জায়গায় ডায়লগ চলাকালীন ব্ল্যাক স্ক্রিনও চোখে পড়েছে।
সবমিলিয়ে, এই ছিল আমার দৃষ্টিতে ‘রকস্টার’। সিনেমা শেষে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, এই সিনেমার টার্গেট অডিয়েন্স সিঙ্গেল স্ক্রিনে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। তবে শাকিব খানের নতুন জঁনরা ট্রাই করা এবং পরিচালক আজমান রুশোর প্রথম প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।






