Select Page

সাহিত্য, চিত্রকলা ও সিনেমা— তিন আর্টফর্মের সংযোগে অনন্য জগাখিচুড়ি ‘বনলতা সেন’

সাহিত্য, চিত্রকলা ও সিনেমা— তিন আর্টফর্মের সংযোগে অনন্য জগাখিচুড়ি ‘বনলতা সেন’

জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের পরিচালিত ছবি ‘বনলতা সেন’। জীবনানন্দ দাশের প্রতি অবসাদগ্রস্ত যে কাউকেই আকর্ষিত করবে এ ধরনের ছবি। তবে বনলতা সেন ছবিটিতে রয়েছে একের পর অসামঞ্জস্যতা, একদমই মোটিভ ছাড়া কর্মকাণ্ড ও কন্টিনিউটির গুষ্টি উদ্ধার করে কিছুক্ষণ পর পর ফেড আউটের মাধ্যমে অন্য সিনে চলে যাওয়ার এক এপিক সাগা।

ছবিটি শুরু হয় জীবনানন্দ দাশের কবিতার পরাবাস্তব কিছু দৃশ্য নির্মাণের মাধ্যমে। তারপরই দেখা যায়, এই সময়ের একজন তরুণ, যিনি কিনা পুরোনো বই সংগ্রহ করেন এবং জগত-সংসার থেকে অমনোযোগী হয়ে খুঁজে বেড়ান জীবনানন্দের লেখা চরিত্রকে।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তার আগের ছবি ‘উনপঞ্চাশ বাতাসে’ও একই ধরনের চরিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। ছবিটির প্রধান চরিত্রকে দেখিয়েছিলেন শার্টের পকেটে বিস্কুট নিয়ে সদরঘাটে অপলক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে। তাই একই ধরনের চরিত্র ছবিটিকে একটি রিপিটেটিভ জায়গায় নিয়ে গেছে।

তো যেই তরুণ জীবনানন্দের লেখা বনলতা চরিত্রকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং কাজকর্ম এমনকি গোসল না করেও সবসময় ঘোরের মধ্যে থাকেন, তিনি কিছুক্ষণ পরপরই কোনো মেয়ের সাথে দেখা হলেই শুরু করেন ফুলটোক্কা খেলা। তার কাজের মেয়ে থেকে শুরু করে, পতিতালয়ের নারী কিংবা তার কাছে বই খুঁজতে আসা পিএইচডি গবেষকের সঙ্গেও প্রথম দেখাতেই তিনি শুরু করেন ফুলটোক্কা খেলা। কীভাবে যে কোনো নারীই এই ফুলটোক্কায় রাজি হয়ে যান, তা ছবিতে কোনোভাবেই খোলাসা হয়নি।

এই ফুলটোক্কা খেলার পাশাপাশি ছবিটিতে আরও রয়েছে আরোপিত আধো-সাধু ভাষার ব্যবহার। একদমই ফেইক এক্সেন্টে চরিত্রগুলো লাগাতারভাবে বলে যায় এসব কথা। এমনকি জীবনানন্দের স্ত্রী তার গায়ের গেঞ্জি চাইতেও কথা বলে কবিতার মতো। যা ছবিটিতে একসময় মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যাঘাত ঘটায়।

ছবিটিতে জীবনানন্দের প্রহেলিকা তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রচণ্ড দুর্বল কম্পিউটার গ্রাফিক্স। যেগুলো দেখলে মনে হবে, ‘কী দরকার ছিল ভাই’। একসময় এই নিম্নমানের গ্রাফিক্সের জ্বালায় ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। অথচ এসব ব্যবহার না করেও দিব্যি সেই দৃশ্য তৈরি করা যেত সহজেই।

সাহিত্য, চিত্রকলা এবং সিনেমা এই তিনটি আর্টফর্মের সংযোগ তৈরি করতে গিয়ে বনলতা সেন ছবিতে তৈরি হয়েছে এক অনন্য জগাখিচুড়ি, যা দর্শককে দ্রুতই বোর করে ফেলে এবং দর্শক বুঝতে পারে না সে কী দেখছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দ্য লাস্ট সাপার’ আর্টের টেবিলে জীবনানন্দকে শুইয়ে দেয়া হয়। সেখানে ভূমেন্দ্র গুহ ও অন্যান্য তৎকালীন সাহিত্যিক, সমালোচকরা বসে বসে খায়। এটুকু পর্যন্তও সহ্য করা যায় কিন্তু হুট করেই জীবনানন্দের কবিতায় দেখানো রোগীর পাশে কমলালেবুকে হোমাজ দিতে গিয়ে লাস্ট সাপারের টেবিল থেকে অনবরতভাবে লো সিজির কমলালেবুর বৃষ্টিপাত শুরু হয়, যা দেখলে মুখ দিয়ে অবলীলায় বেরিয়ে আসে, ‘ইয়ে সাব কেয়া দেখনা পাড় রাহা হে, আচ্ছা হে মে আন্ধা হু…’।

‘বনলতা সেন’ ছবিটিতে রয়েছে প্রচণ্ড পরিমাণ তাড়াহুড়ো ও অযত্নের ছাপ। ছবিটা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম, সরকারি অনুদানের পাশাপাশি একজন প্রডিউসারও নিয়েছিলেন পরিচালক। একসময় প্রডিউসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অনুদানে পঞ্চাশ লাখ টাকার বেশি দেওয়া হয়। প্রডিউসার দিয়েছিলেন আরও ৬০ লাখ টাকা। এক কোটি টাকার বেশি পাওয়ার পরও কম্পিউটার গ্রাফিক্সের এই হাল দেখে হয়ত প্রডিউসারও চমকে গিয়েছিলেন।

এতগুলো অসামঞ্জস্যতার মাঝেও স্বস্তি ছিল সোহেল মণ্ডল ও খায়রুল বাশারের অভিনয়। জীবনানন্দ দাশের চরিত্র খায়রুল বাশারের সাবলীল অভিনয় এবং ঘোরে থাকা এই সময়ের তরুণ ছেলের চরিত্রে সোহেল মণ্ডলের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় ছবিটিকে চেষ্টা করেছে সফলতার দিকে নেয়ার। কিন্তু তাদের অভিনয়ের নিদারুণ অপচয় ছাড়া কিছুই হয়নি।

তবুও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ জীবনানন্দ দাশকে ঘিরে ছবি বানানোর প্রচেষ্টাকে সম্মান জানাই। সেই সঙ্গে অযত্ন আর তাড়াহুড়ো না করলে ছবিটি হয়ত আরও বেশি উপভোগ্য হতে পারতো বলেও বোধ করি।


About The Author

জুবায়ের ইবনে কামাল

এক পৃথিবী লিখব বলে একটি খাতাও শেষ করিনি

Leave a reply