গল্প নয়, অভিজ্ঞতার নাম ‘রইদ’
রইদ-এ ধাক্কা দেওয়া একটা সিন হইলো, যখন বউ সাদুরে বলে— ‘তুমি আমারে শিকলে বাধলা!’ এ সংলাপ দিয়ে ততক্ষণ যা যা দেখনো হইতেছিল এবং যেখানে গিয়া গল্প থামে, তার একটা সারাংশ তৈরি হয়। আচ্ছা, ব্যাপারটা এমন না যে এটা গল্প নিয়ে আলোচনা। বরং সিনেমার পুরো যে আবহ, তাতে শুধু চোখ রাখলেই এ প্রশ্ন বা বিস্ময় তোলা যাইতো। কিন্তু মানুষের জীবনের ভাষাও দরকার আছে। এ ভাষা দিয়ে পুরো ঘটনার একটা প্রকাশ ঘটতেছে।
সাদুর বউ যে শুধু লোহার শিকলরে শিকল হিসেবে ধরতেছে, তা না। বরং এমন শিকল ছাড়াও শিকল আছে, যেটা আমরা সিনেমার শুরু থেকে সাদুরে খুঁজতে দেখি, দুই নর-নারীরে খুঁজতে দেখি। সেটা হলো তাল। তাল হইলো আসত্তি। যেখানে এসে তারা নিজেদের সম্পর্কের এক অর্থ তৈয়ার করতে পারে।
গল্প অনুসারে এবং দৃশ্য অনুসারে, সাদু আর তার বউ যেখানে বসবাস করে, সেখানে তো আর কেউ নাই। গাছ, লতাপাতা, পাহাড়, জলভূমি ও পশুপ্রাণ। কিন্তু দুইটা মানুষ বা মানব-মানবী একলা এক লগে থাকলেই যে তারা বান্ধব হয়ে যাবে, এমনও কারণ নাই। পাশাপাশি তো এমনে এমনে থাকে না, পরস্পরের ভাব-ভাষাও চুরি করে। এই যে আসত্তি তৈয়ার হয় মানুষে মানুষে, এ সিনেমায় তা তাল হয়ে আসছে। বস্তু হইলে যেমন সমস্যা নাই। কোনো কিছু বুঝাইতে দেখার শরণাপন্ন হইতে হয়। আবার অবস্তু হইলেও সমস্যা নাই। কারণ মনের ভেতর কী চলতেছে, তা তো বোঝানো মুশকিল। হ্যাঁ, এ সিনেমায় কথা কম, অভিব্যক্তি বেশি— অর্থ নিলে আমরা হয়তো অনেক কিছু বুঝি। কিন্তু জগত তো বস্তুময়।

তাল একটা উপলক্ষ্য। এটি অন্তর্গত বন্দিত্ব ও সংযোগ— যেখানে এসে সাদু ও তার বউ নিজেদের কাছাকাছি মনে করছে। খেয়াল করলে সাদু ছাড়া কাউরে তালের পিঠা খাইতে দেখা যায় না। সাদুর বন্ধু যখন খাইতে চায়— মাটিতে পড়ে যায়। তাল এমন কিছু, সেই বিরল ফলগুলোর একটা, যার বিলীন পর্যন্ত আলাদা আলাদা ব্যবহার আছে। আর আসত্তি বস্তু নয়, বরং বস্তুগত জীবনের শর্ত— যা অনেক অনেক অবস্থার ভেতর একক হিসেবে বিরাজ করে। এ তুলনা কষ্টকল্পিত মনে হইতে পারে। তা সত্ত্বেো তাল নিয়ে আমরা আলাদা আলাদা কথা কইতে পারি, ইঙ্গিত পাইতে পারি। কিন্তু পর্দায় আমরা যা দেখি, তা এই মিলামিলি ছাড়াও চলে। আবার নিশ্চিত হওয়া ছাড়া আমাদের চলে না। অথচ জীবনভর হিসাব মেলাতে গিয়ে শেষমেষ মিলে না।
সিনেমাটা দেখতে যাওয়ার আগে শুনতেছিলাম— পড়ালেখা করে না গেলে বোঝা যাবে না। না, পড়ালেখা করা হয় নাই। লোকের মুখে মুখে যা শোনার শুনছি। সিনেমা দেখে মনে হইল, মিথের সঙ্গে ধর্মীয় বয়ানের সঙ্গে মিলায়া দেখা যায় এক অর্থে। এটা আমাদের পূর্বানুমানের হাজিরানা, নিজের জানার সঙ্গে মিলায়া দেখার বিষয়, যা সাধারণত করেই থাকি। কিন্তু এমনও হতে পারে, কোনো সিনেমায় আপনারে মানুষ হিসাবে অন্যদের চেয়ে উপরে তুলতে পারে না। সার্থক সিনেমা নিশ্চয় অনেক ধরনের হয়। এমনও তো— দর্শক আলাদা হইতে পারে, অর্থবোধক হইতে সমস্যা নাই। যেমন; দুনিয়া সবার জন্য অর্থবোধক। এমন সম্ভাবনা কি ‘রইদ’-এরও নাই?
এখানে নির্মাতা, অর্থাৎ মেজবাউর রহমান সুমনের দায় আছে। দেখেন, ‘রইদ’-এর একটা মোলায়েম গতি আছে। সেই গতিতে কাহিনী কতটা এগোলো, তা নয়; বরং একটা সারাউন্ডিং পরিবেশ সৃষ্টির মধ্যে দর্শকের যে কানেকশন, যেখানে বাস্তব আছে, অবাস্তব বিষয় আছে— যেভাবে মানবজীবন ফ্যাংশন করে। কিন্তু সুমন যেন এক পর্যায়ে ইঙ্গিত না দিয়ে থাকতে পারলেন না, যেন দর্শকদের আলোকিত করতে হবে।

‘রইদ’ সিনেমায় একটা খুঁতই মনে হইলো আমার। ওই যে ‘গন্ধম’ প্রসঙ্গ। একদম সিনেমার শেষ দিকে এ বিষয়ে দুইটা সংলাপ আছে— যেন এতক্ষণ দর্শক যা দেখল, তা বুঝায়া দেওয়া হলো। আমার মনে হলো, এখানে এসে মেজবাউর রহমান সুমন ও উনার রাইটার টিম কিছুটা হইলেও আত্মবিশ্বাস হারাইছেন। আচ্ছা, এমনটা নাও ঘটতে পারে। যেহেতু আমি উনাদের মনের ভেতর ঢুইকা দেখি নাই। কিন্তু এই রকম তথ্যবিহীন ও তত্ত্ববিহীন গল্পের ভেতর ‘গন্ধম’ শব্দটা যেমন আসে, সন্দেহ আসে। যেন বলতেছে— ম্যালা গল্প হইল, চল এবার গল্পে দাঁড়ি টানি। হ্যাঁ, এমনও হতে পারে গন্ধম শব্দটা দর্শককে বুঝিয়ে দেয় না; বরং নতুন প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়।
সেটাই তো সিনেমা। যেটা আমরা সিনেমা হল থেকে ঘর পর্যন্ত নিয়া আসি। কথা বলি। এ সিনেমা নিয়া আরেকটু জটিলতা হইলো— দর্শক গল্প ডিকোড করতে ব্যস্ত থাকতেছে। রহস্য আর অর্থ এক জিনিস না। কোনো সিনেমার প্রতীক ভাঙতে পারলেই তার অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে না।
গল্পই তো সিনেমা না। এক্সপেরিয়েন্সের বিষয়; যেখানে খাবারের ঘ্রাণ আপনে হয়তো নাও পাইতে পারেন, কিন্তু ফিল করতে পারবেন। ‘রইদ’-এ এ ফিলগুলো আছে। এ কারণে আমি যখন সিনেমাটা দেখছি, তখন গল্পে কী ঘটছে বা কতটুকু ঘটছে, তার বদলে পুরো পরিবেশের সঙ্গে থাকতে পারছি কিনা, বা ভিজ্যুয়াল আসলে কই নিয়া যাইতেছে— সেটা হলো একটা ঘটনা। মানে কোনো বিষয় থাকা বা না থাকা দিয়ে আপনি ওই বিষয়টা অনুভব করতে পারেন। ‘রইদ’-এ সেটা থাকার মধ্য দিয়ে অনুভব করছি। ফলে ‘রইদ’ তার সারাউন্ডিং হিসেবে চিন্তার খানা হয়ে থাকে। এবং আপনি যখন প্রকৃতির মধ্যে থাকেন (মানুষের খাসলত, সেটাও তো প্রকৃতি), তখন বোধহয় ভাষা ছাড়াও দুনিয়ার অন্য সব জিনিস দিয়া জীবনরে বুঝতে পারেন।

সিনেমার একটা দৃশ্যে সাদুরে বলা হয়, পাগলীকে তালাক দিতে। তখন সাদু বলে, ‘পাগল কি তালাক বোঝে’। এ ডায়ালগটা দুইটা ডিফরেন্ট দুনিয়ার কথা বলে। যেখানে সবকিছু একসঙ্গে থাকে, কোনো কিছু আলাদা না। পাগলীর দুনিয়া, যেখানে বিচ্ছিন্নতা বইলা কিছু নাই! আসলে? এটা শুধু পাগলীর মানসিক অবস্থার কথা নয়; বরং সম্পর্ক বিষয়ে ভাষার সীমাবদ্ধতার কথাও হতে পারে। তালাক, বিয়ে ও মালিকানা সামাজিক ধারণা। কিন্তু আকর্ষণ, ক্ষুধা, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদ এসব যেন মানুষর সঙ্গে ইনবিল্ট।
আসত্তি তো জানা গেল, জানা গেল কি? বিচ্ছিন্নতা ছাড়া বোঝা যাবে!পাগলী যখন নিজের ইচ্ছায় উধাও হয়ে যায়, তখন যুদা হওয়া যে এক হওয়ার বাসনা, তা টের পায় সাদু। সম্ভবত আমাদের চেতন হওয়ার দরোজাটা তখন খোলে।
মনে হইতেছিল— পাগলী উধাও হয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে ‘রইদ’ শেষ হবে। কিন্তু সাদুর পৈশাচিক ক্ষুধা তখনো দেখার বাকি থাকে। এ ক্ষুধা আসলে কী?— ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রণা। দুনিয়ার সবকিছু খায়া ফেলেও দেখা যাবে ক্ষুধা মিটছে না। তখনও বাকি থাকে কিছু্। তাই সাদুরে আবার ছুটতে হয়। তাল খুঁজতে। এখন হয়তো বোঝা যায়, যুদা হওয়ার বিষয়টা শুধু শরীরের নয়; হৃদয়েরও। যে কারণে অজ্ঞাত পিতার সন্তান ধারণ সত্ত্বেও পাগলীরে খুঁজতে হয় সাদুরে!
শেষ পর্যন্ত সে তালের পেছনে ছুটে, আবার পাগলীরও পেছনে ছুটে। দুই ক্ষেত্রেই সে এমন কিছুর সন্ধানে আছে, যা হাতে পেয়েও পুরোপুরি পাওয়া যায় না। মনে হয়, ‘রইদ’-এর সবচেয়ে বড় ঘটনা তাল না, গন্ধম না, এমনকি গল্পও না। বরং যা আর সামনে নাই, সেই অনুপস্থিতির অনুভূতি। কারণ মানুষ বোধহয় সব সময় যা কাছে আছে তা দিয়ে না, যা হারাইতে পারে বা হারাইয়া ফেলছে তা দিয়াই নিজের দুনিয়া বুঝে। পাগলী উধাও হওয়ার পর যেমন সাদুর দুনিয়া বদলাইয়া যায়। তখন বোঝা যায়, যুদা হওয়া শুধু দূরে সরা না; অনেক সময় এক হওয়ার বাসনাও যুদা হওয়ার ভেতর দিয়াই জন্ম নেয়।

আসলে ‘রইদ’-এ যা আছে, তার চেয়ে যা নাই, অনেক সময় তা-ই বেশি কাজ করে। পাগলী যখন সামনে থাকে, তখন সে একটা চরিত্র। কিন্তু উধাও হয়ে যাওয়ার পর সে সাদুর ভেতরের শূন্যতা হয়ে ওঠে। তাল যখন হাতে থাকে, তখন সে একটা ফল; কিন্তু হারাইয়া গেলে সে আকাঙ্ক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো এ কারণেই সিনেমাটা দেখা শেষ হওয়ার পরও শেষ হয় না। ‘রইদ’ তখন উপস্থিতির সিনেমা না, অনুপস্থিতির সিনেমা। যে অনুপস্থিতি মানুষকে খুঁজতে বাধ্য করে, মনে রাখতে বাধ্য করে, আবার অর্থ তৈয়ার করতেও বাধ্য করে।
আচ্ছা, সব শেষে এই কথাটা বলি— সাদুরে সাদু আর সাদুর বউরে সাদুর বউ ভাবা ছাড়া এ সিনেমা দেখা সম্ভব না। কিন্তু সিনেমাটা আমি দেখে ফেলছি। অর্থাৎ তাদের সেটা ভাইবাও ফেলছি।






