Select Page

মিতা চৌধুরীকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়

মিতা চৌধুরীকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়

১৯৭৫ সালের ৬ ডিসেম্বর। এই তারিখটি বিটিভির ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা। সেদিন প্রচারিত হয়েছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা টিভি নাটক ‘বরফগলা নদী’। জহির রায়হানের উপন্যাস থেকে এর নাট্যরূপ দেন জিয়া আনসারী। আর নাটকটি প্রযোজনা করে নন্দিত হন আব্দুল্লাহ আল মামুন। নাটকের মূল নারী চরিত্র ছিল সুবর্ণা মুস্তাফার। তার চরিত্রের নাম হাসিনা। এতে অভিনয় করে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসেন সুবর্ণা। তার জীবনের সেরা নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘বরফগলা নদী’।

সেই তুলনায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন মিতা চৌধুরী। তার চরিত্রের নাম লিলি। মিতা ইতিমধ্যে জ্বলজ্বল করছেন খ্যাতির দীপ্তিতে। কিন্তু ছোট চরিত্র বলে হেলা করেননি। এক সাক্ষাৎকারে মিতার অভিনয়দর্শন টের পাওয়া যায়, ‘নাটকে তুমি যেটাই করো, তুমি বড় পার্ট বা ছোট পার্ট যাই করো, বা ঘর ঝাড়ুই দাও, শুধু অভিনয়ের ব্যাপার নয়, হানড্রেড পারসেন্ট—পুরোটা দিতে হবে নিজের। অভিয়াসলি ইউ হ্যাভ টু বি সিনিসিয়ার। সো সেটা তো তোমাকে এনজয় করতে হবে।’
লিলি চরিত্রে অভিনয় করে মিতা চৌধুরী দেশ কাঁপিয়ে দেন। সামান্য একটি চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়ে দেন।

১৯৭৭ সালের ৩০ জানুয়ারি। জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবসেই ছিল বিটিভির নিয়মিত নাটক প্রচারের শিডিউল। সেদিন প্রচারিত হয় ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’। যথারীতি প্রযোজনা করে প্রশংসিত হন আব্দুল্লাহ আল মামুন। উপন্যাসের নাট্যরূপ দেন শহিদুল হক খান। টেলিভিশনের প্রায় সমস্ত দক্ষ অভিনয়শিল্পী এই নাটকে অভিনয় করেন। নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শিউলি। বৈচিত্র্যময় এই চরিত্রে অভিনয় করে দর্শককে স্তব্ধ করে দেন মিতা চৌধুরী।

জহির রায়হানের পর হুমায়ূন আহমেদ। তখনও তিনি টিভির জন্য নাটক লেখা শুরু করেননি। ‘বরফগলা নদী’র পর হুমায়ুন আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’। ১৯৮০ সালে এই উপন্যাসটির নাট্যরূপ দেন আল মনসুর। প্রযোজনা করেন মোস্তফা কামাল সৈয়দ। এই নাটকে মন্টুর চরিত্রে অভিনয় করেন আল মনসুর নিজেই। তার সহশিল্পী ছিলেন মিতা চৌধুরী। তিনি অভিনয় করেন রাবুর চরিত্রে। এমন অভিনয় বহু বছর দেখেনি দর্শক। সহজাত অভিনয়ে তিনি যেভাবে প্রতিটি চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতেন, সেভাবেই রাবু চরিত্রটিকে দর্শকের মনের মুকুরে চিরতরে গেঁথে দেন মিতা।

‘নন্দিত নরক’-এ ভাই-বোনের চরিত্রে অভিনয় করলেও মনসুর-মিতা ছিলেন সত্তর দশকের নন্দিত জুটি। আফজাল-সুবর্ণারও আগে তারা জুটিপ্রথার শিকড়ে সার দেন। কার সাথে নাটক করেননি মিতা? সৈয়দ আহসান আলী সিডনি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, বুলবুল আহমেদ, হুমায়ূন ফরীদি, আসাদুজ্জামান নূর, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আফজাল হোসেন—সবার সঙ্গে মিতা চোখে চোখ রেখে অভিনয় করেছেন। তবে আল মনসুরের সঙ্গে তার জুটির আবেদন ছিল অন্যরকম। এই দুজনেই আবার একটা সময় নাটকের আঙিনা ছেড়ে পাড়ি জমান বিদেশে। কিন্তু উড়াল দেওয়ার আগে গভীর পদচিহ্ন রেখে যান দুজনেই।

মিতা চৌধুরীর প্রথম দুটি নাটকই আল মনসুরের সঙ্গে। একটি ‘আরেকটা শহর চাই’, অপরটি ‘অয়নান্ত’। সমরেশ বসুর উপন্যাস থেকে এই নাটকের নাট্যরূপ দেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। হাসিবুল হাসান রচিত ‘আরেকটা শহর চাই’ প্রযোজনা করেন আতিকুল হক চৌধুরী। টেলিভিশনের অগণিত মুখের মতো মিতার মুখটিও প্রথম আবিষ্কার করেন এই আবিষ্কারক-নির্মাতা। বহুদিন ধরে মিতাকে চোখে চোখে রাখছিলেন জহুরী আতিকুল। ষাটের দশকে টিভিতে উর্দু শেখার অনুষ্ঠানে মিতা অংশ নিতেন। তখন থেকেই এক চৌধুরীর ওপর নজর ছিল আরেক চৌধুরীর।

তবে প্রদীপ জ্বালানোর আগে থাকে সলতে পাকানোর গল্প। এই গল্পে প্রজ্জ্বলনের কাজটি করেছেন প্রযোজক খালেদা ফাহমি। সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুলে পড়তেন মিতা। স্কুলে ‘দ্য স্টোরি অফ কিং মাইডাস’ নামে একটি ইংরেজি নাটকের রিহার্সাল চলছিল। মিতার করার কথা ছিল মন্ত্রীর চরিত্র। যা হয় সবসময়, রাজা চরিত্রের নির্দিষ্ট শিশুশিল্পী এলো না। মিতার পাঠ মুখস্ত ছিল। তাকেই দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো রাজার চরিত্রে। সেই নাটক ‘লাইভ’ প্রচারিত হলো পাকিস্তান টিভির ঢাকা কেন্দ্র থেকে। মিতাকে লোকে চিনে ফেলল।

স্বাধীনতার পর ঘটল মিতার মেধার স্ফুরণ। হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি দিলেন। ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম হলেন। মেয়েদের মধ্যে হলেন প্রথম। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ছাত্রাবস্থায় তারকা বনে গেলেন মিতা। বাংলাদেশ বেতারে খবর পড়লেন। বিটিভিতে পড়লেন ইংরেজি খবর। ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক’ বলে একটি অনুষ্ঠান করে সাড়া ফেলে দিলেন। এই অনুষ্ঠান দেখে মিতার কাছে চিঠি লিখতেন সুবর্ণা মুস্তাফা।

এক সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন সুবর্ণা, ‘‘আমি যখন ‘বরফ গলা নদী’ করতে মহড়ায় গেছি সেখানে ফেরদৌসী খালা, মিতা আছে। কেউ একজন বললো, ও পারবে? মিতা আমার পাশে বসা। মিতার সাথে আমার আলাপ ছিল অন্যভাবে। এমনিতে মিতা চৌধুরীর ফ্যান আমি। আরেকটা হচ্ছে ও ওয়ার্ল্ড মিউজিক করতো। আমি চিঠি লিখতাম ওকে। ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি আমাকে চিঠি লেখো? আমি বললাম, হ্যাঁ। কে যেন তখন বললো, ও পারবে? তখন মিতা আমার হাত ধরে বললো, ও পারবে। এই তুই বল না, পারবি। মন খারাপ করিস না।’’

সুবর্ণা মুস্তাফা, মিতা চৌধুরী, শম্পা রেজা, রিনি রেজা, প্রিসিলা পারভিন, দিলশাদ খানম—সত্তর দশকের উজ্জ্বল সব টিভি অভিনেত্রী। তাদের পদচারণায় মুখর অভিনয়ের উঠান। ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি’ গেয়ে যেন টেলিভিশনের নাটককে আরো স্বর্ণময় আরো বর্ণময় করে তুলতে তখন তারা সদা ব্যস্ত, সদা উদ্দীপ্ত।

ফিরে যাই আতিকুল হক চৌধুরীর কাছে। ১৯৭৩ সাল। একদিন মিতার মা আক্তার বানুর কাছে ফোন করলেন আতিকুল। ভদ্রমহিলা ছিলেন গৃহিণী। মিতার বাবা আমিনুল হক চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপু‌টি গভর্নর। মিতাকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতেন তার মা-ই। ‘না’ ‘না’ করে কেবল এগিয়েই দিয়েছেন মেয়েকে। বিটিভির প্রযোজক আতিকুল হক চৌধুরীকেও প্রথমে মানা করলেন। পরে রাজি হলেও শর্ত ছিল—‘একবার’। কিন্তু সেই যে মিতা নাটকে অভিনয় শুরু করলেন, তা চলল ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত।

এরমধ্যে মিতা চৌধুরী ছোট্ট টিভি বাক্স কাঁপিয়ে ফেললেন। একের পর এক নাটকে অভিনয় করে গেলেন। তার সাবলীল ও স্বাভাবিক অভিনয় প্রশংসিত হল গোটা দেশে। অনায়াস দক্ষতায় বিটিভির শ্রেষ্ঠ সময়ে শ্রেষ্ঠ নাটকগুলোতে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেলেন একটানা। তার ডাক এলো থিয়েটার থেকেও। এবারও মা করতে দেবেন না, বললেন—‘স্রেফ একবার!, ‘চোর চোর’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়,’ রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বোন’- নিজেকে মিতা ছড়িয়ে দিলেন মঞ্চেও।
খ্যাতির তুঙ্গে থাকা অবস্থায় একদিন ছন্দপতন।

১৯৭৭ সালের আগস্ট মাসে বিয়ের পিড়িতে বসলেন মিতা চৌধুরী। পত্রমিতালীর মাধ্যমে শহীদুর রহমানের সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে পরিণয়। মিতা চৌধুরী হয়ে গেলেন মিতা রহমান। চলে গেলেন স্বামীর কর্মস্থল ইংল্যান্ডে। বেদনায় আক্রান্ত হল গোটা দেশ। দেশের দর্শক চিরদিনের মতো আক্রান্ত হলো এক নষ্টালজিয়ায়। এই নস্টালজিয়ার নাম মিতা চৌধুরী।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিতার নামটি উচ্চারিত হচ্ছে আমাদের অভিনয়ের আঙিনায়। মিতা এক আক্ষেপের নাম, মিতা এক আবেগের নাম। টেলিভিশনের সোনালি সময়ের দর্শকের কাছে মিতা নামটি বড় মায়াময়, বড় প্রেমময়। আর তার হঠাৎ চলে যাওয়া, সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ করে দেওয়া—চিরকালের এক আফসোস।

বিলেতে কয়েক যুগ কাটিয়ে মিতা চৌধুরী দেশে আসেন। কিছু নাটকে অভিনয় করেন। সিনেমায়ও অভিনয় করেন। কিন্তু সত্তরের মিতার সঙ্গে এই মিতার বড্ড ফারাক। দর্শক কেবল খুঁজে ফেরেন সাদাকালো টেলিভিশনের মিতাকে। এই মধুর রোগের তো চিকিৎসা নেই।

২০২২ সালের অক্টোবরে মিতার স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাকে ফিরে যেতে হয় লন্ডনে। স্বামীর শোক তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ২০২৩ সালের ২৯ জুন মিতা চৌধুরীও চলে যান না ফেরার দেশে।

আজ মিতাকে হারানোর দিন। চলে গেলেও মিতা রেখে গেছেন তার কাজ। তিনি রেখে গেছেন টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের স্বর্ণখচিত অভিনয়ের মৌচাক। তিনি যখন প্রবাসে ছিলেন, তখনও তাকে মনে রেখেছেন দর্শক। তিনি এখন পৃথিবীতে নেই, দর্শক তবু তাকে মনে রাখবেন। মিতা চৌধুরীকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়।


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply