Select Page

অ্যাকশন কিং জসিম

অ্যাকশন কিং জসিম

অ্যাকশনে ঢালিউডে জসিম বেস্ট। রুবেল মার্শাল আর্টে অসাধারণ, এর ভেতর দিয়েই তার অ্যাকশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মান্না রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার উপর বক্তব্যধর্মী ছবিতে অ্যাকশনে নিজস্বতা তৈরি করেছে। তার অভিনয়েও অ্যাকশনটা অনবদ্য। কিন্তু জসিমের অভিনয়ক্ষমতা এ দুজনের থেকে এগিয়ে। বিশেষ করে সত্তর, আশির দশকে ভিলেন হিসেবে যখন জসিম ক্যারিয়ার শুরু করেছিল তখন নাম্বার ওয়ান ভিলেন ছিল। তার ফ্যানবেজও গড়ে উঠেছিল ভিলেন ইমেজে।

পরে অ্যাকশন হিরো হিসেবেও নিজের রাজত্ব কায়েম করেছিল। জসিমের ফাইটিং-এর ধরনেও নিজস্বতা ছিল, ঢালিউডে অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতাও জসিম। তার এক্সপ্রেশনের মধ্যেও অ্যাকশনের সেরা দিকটি ফুটে ওঠে। জসিমের ফাইটিং দক্ষতার মধ্যেও নিজস্ব স্টাইল এবং অরা যাকে বলে সেটা বাকিদের থেকে অনেক বেশি ছিল। ভিলেন ও হিরো দুই ইমেজে জসিমের অ্যাকশন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আরমান, মোসলেম যারা বহু ছবিতে ফাইট ডিরেক্টর ছিল তারা জসিমের ছাত্র ছিল।

অ্যাকশনে জসিমের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো –
টাইগার, বাংলার নায়ক, লালু মাস্তান, দোস্ত দুশমন, আখেরি মোকাবেলা, কালিয়া, দাগী সন্তান, স্বামী কেন আসামী, সন্ত্রাসী রাজা, রাজা গুণ্ডা, জিদ্দি, গরিবের ওস্তাদ, জিদ্দি, সারেন্ডার, মাস্তান রাজা, রকি।

হিন্দি আইকনিক মুভি ‘শোলে’-র আনঅফিসিয়াল রিমেক ‘দোস্ত দুশমন’ (১৯৭৭)-এর আইকনিক ভিলেন গাব্বার সিং চরিত্রটি করেছিল জসিম। জসিম তখন ঢালিউডের ব্যাপক জনপ্রিয় ভিলেন ছিল। হিন্দিতে আমজাদ খানের দুর্দান্ত অভিনয়ের পাশাপাশি বাংলায় জসিমের চরিত্রটিও তখনকার দর্শক দারুণভাবে পছন্দ করেছিল।

জসিমের সবচেয়ে বেশি অ্যাকশনের ছবি ‘টাইগার’। পরিচালক জিল্লুর রহমান।
জসিম পুলিশ ইন্সপেক্টর হয়ে একটা এলাকায় যায় সেখানে বনে গাছ কাটা হচ্ছে, থানায় জুয়া খেলা হচ্ছে, মাদকে ভরে গেছে। সেই এলাকায় রাজত্ব আহমদ শরীফের। সঙ্গত কারণেই সেগুলোতে আঘাত আসামাত্র আহমদ শরীফ টাকার ব্রিফকেস হাত কিনতে যায় জসিমকে কিন্তু পারে না। পুলিশের পোশাক একশো টাকায় কেনা যায় বলে কটাক্ষ করলে জসিমের এক ঘুষিতে আহমদ শরীফের তিনটা দাঁত হাতে চলে আসে। জসিমের বিয়ের দিন তার ওপর আঘাত আসর কৌশলে। তারপর জসিম হারায় কিন্তু হারায় না আবার ভয়ঙ্কররূপে ফিরে আসে। একেক গেটাপে হাজির হয় রুদ্রমূর্তি নিয়ে। ফাইটিং ছিল লাজবাব। ক্ষেত্রবিশেষে আজকের ডিজিটাল সময়ের চেয়েও আধুনিক ছিল জসিমের ফাইটিং সিকোয়েন্সগুলো।

‘কালিয়া’ ছবির সাদামাটা জসিমকে মদ খাইয়ে মাস্তান বানানোর যে প্রক্রিয়া আহমেদ শরীফ করে সেখানে বদলে যাওয়া জসিম অন্যরকম। ‘মাস্তান রাজা’ ছবিতে জেল খেটে বের হবার পর গাংগুয়ার সামনে পড়ে জসিম। যে গাংগুয়া ছোটবেলায় তার কামাই করা টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল। জসিম গাংগুয়া বাহিনীকে শায়েস্তা করার সময়ে যে বডি ল্যাংগুয়েজ দেখিয়েছে এটা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব।

‘বাংলার নায়ক’ ছবির ফিনিশিং-এ মারাত্মক একটি সিকোয়েন্স। শাবানার বাবাকে আহমেদ শরীফ পুড়িয়ে মারে। ছবির শেষে চুরুট ধরিয়ে জসিম সেটি শাবানার হাতে দেয় আর আহমেদ শরীফকে দেখিয়ে বলে-‘মারুন’। তারপর ড্রাম বাজাতে থাকে। শাবানা বাবার মর্মান্তিক সেই মৃত্যুদৃশ্য স্মরণ করে চুরুট ছুঁড়ে দেয় আহমেদ শরীফের দিকে। নায়ক, নায়িকা, ভিলেন সবার অভিনয়ই তখন লাজবাব।

জসিমের অ্যাকশন ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রিয় ছবি ‘আখেরি মোকাবেলা’। রায়হান মুজিবের পরিচালনায়।
জসিমকে পাগল বানানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মাহবুব খানের দুর্নীতিগ্রস্ত টিম। হাসপাতালের নামে রোগীদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে পাচার করাই তাদের পেশা। একসময় জসিম এখানে আসলে ডাক্তার শাবানার সন্দেহ জাগে। জসিমকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের বাবার সাথে হওয়া ষড়যন্ত্রের খোঁজও পায় শাবানা। তারপর শাবানাকেই অপারেশন করার ধৃষ্টতা দেখালে জসিম বাঁচায়। তারপর শুরু হয় সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই। পুরো ছবিটাই ছিল টান টান উত্তেজনার। জসিমের অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো জাস্ট চোখ জুড়ানো।

‘জিদ্দি’ ছবিতে বাবা, ভাই ও বোনহত্যার প্রতিশোধ নিতে জসিমের রমরমা অ্যাকশন ছিল। কলেজ যাবার পথে বোন কবিতাকে গুন্ডাদের বিরক্ত করা থেকে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এবং তা বিশাল পর্যায়ে যায়।

কাজের বেটি রহিমা’ ছবিতে অন্ধ শাবানার চোখ অপারেশনের জন্য জসিম যায় বক্সিং লড়তে। প্রথমদিকে একের পর এক আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় জসিম। পড়ে থাকা অবস্থাতেই বলতে থাকে ‘আমাকে শক্তি দাও খোদা।’ তারপর উঠতে থাকে। মুখের রক্তটা ফেলে দিয়ে সিংহ পুরুষের চাহনিতে বিদ্ধ করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে। তারপর দু’পায়ের ব্যালেন্স ঠিক করে প্রতিদ্বন্দ্বীর আঘাতকে প্রতিহত করে এবং জয়ী হয়। ঐ সময় জসিমের অভিনয় জাস্ট আগুন ছিল। ক্লাইমেক্সে শাবানার অপারেশন হতে দেবে না সেজন্য দলবল নিয়ে আসা মাহবুব খানকে কৌশলে হাসপাতালের ছাদে নিয়ে যায় জসিম ও নূতন। ছাদের দরজা লক করেই ডাক্তারের বেশ খুলে ফেলা জসিমের বডি ল্যাংগুয়েজ ছিল অন্য লেভেলের।

‘সন্ত্রাসী রাজা’ ছবিতে লুক আর বডি ল্যাংগুয়েজে যেভাবে অ্যাকশন তুলে ধরেছে জসিম তা আর কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

‘রকি’ ছবিতে ফাইটার জসিম ডাবল রোলে অসাধারণ এছাড়া ‘সারেন্ডার, দাগী সন্তান, গরিবের ওস্তাদ’ ছবিগুলোতেও অনবদ্য ছিল।

সব মিলিয়ে জসিমই ঢালিউডের শ্রেষ্ঠ অ্যাকশন স্টার।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply