কাজী নওশাবা আহমেদ— আমাদের ফিনিক্স পাখি
রাত নামলে একটা শহর শুধু নিঃশব্দ হয় না, ঢেকে ফেলে তার অগুনতি গোপন রক্তাক্ত দাগ। প্রসঙ্গ কাজী নওশাবা আহমেদ। তাকে অল্প কথায় এভাবে বর্ণনা করা যায়— ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সময় আটক এবং পরবর্তীতে মিডিয়ায় এক ধরনের কালো তালিকাভুক্ত হয়ে পড়েন। এমন ট্রমা সত্ত্বেও এক সাহসিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। যেন ফিনিক্স পাখি, ছাই থেকে পুনর্জন্ম ঘটা তার নিয়তি।

নওশাবার সামনে যখন অধিকাংশ দরজাই বন্ধ, তখন তিনি থিয়েটারের মাধ্যমেই খুঁজে পেয়েছিলেন আরোগ্য। এখন অভিনয় ও চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন রোর্ডের দায়িত্বের পাশাপাশি বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং আরো অনেকের সঙ্গে থিয়েটারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধও তাকে মাঝে মাঝে শিরোনামে আনে। আর নওশাবার এ দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতিশীল চরিত্রের দিশা পেতে তার বাস্তব সংগ্রামের দিকেই তাকাতে হবে।
এক সময় নওশাবার চোখে কখনো জ্বলত চারুকলার ক্যানভাসের রঙ, কখনো সিসিমপুরের ইকরির নিষ্পাপ কৌতুহল— আজ সেখানে এক গভীর ও নীরব সমুদ্র। সেই সমুদ্রে ঢেউ তোলে না কোনো আক্ষেপ, শুধু জমা হয়ে আছে এক না বলা ইতিহাস। বর্তমানের শান্ত আলোর গভীরে লুকিয়ে থাকা একঝাঁক ঝড়ের ইতিহাস কাঁপিয়ে দিয়ে যায় তার চারপাশ।
২০০৪ সাল। একটি তরুণী মেয়ে ক্যানভাসে রঙের খেলা ছেড়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিল। মডেলিং, বিজ্ঞাপনের ঝলমলে আলো আর তারপর শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘সিসিমপুর’-এর সেই সুপরিচিত ইকরি মিকরি ও ভূতো পাপেটকে কণ্ঠ দিয়ে জীবন দেয়া। পর্দার আড়ালে থেকে যে কণ্ঠ লাখো শিশুর মুখে হাসি ফুটিয়েছিল, এর আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিলেন তিনি। ছোটপর্দায় ‘ছোটবেলা বড়বেলা’ আর ‘ললিতা’র মাধ্যমে অভিনেত্রী হিসেবে নজর কাড়ার পর ২০১১ সালে ‘সোনাটা’ নাটকের মধ্য দিয়ে মঞ্চের তক্তায় তার পায়ের ছাপ পড়ে। এর পর সেলুলয়েডের রূপালী জগত। ২০১৩ সালে ‘উধাও’ চলচ্চিত্রে ভিন্নধর্মী অভিনয় দিয়ে বড়পর্দায় পথচলা শুরু। এর পর ‘ছুঁয়ে দিলে মন’, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে ‘ভুবন মাঝি’ও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’হ্রস্ব দৈর্ঘ্যের চরিত্রে দেখা যায়। ২০১৭ সালের তুমুল জনপ্রিয় থ্রিলার ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর ‘সিনথিয়া’ চরিত্র—নওশাবা তখন বাংলা চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাময়, উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। সাফল্য যখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, ঠিক তখনই জীবনের গল্পে নেমে এলো চরম এক অন্ধকার মোড়, কোনো থ্রিলার সিনেমার দৃশ্যকেও যা হার মানায়।

২০১৮ সালের আগস্ট। সেই অভিশপ্ত বিকেল। বাতাস তখন ভারি হয়ে উঠছিল রাজপথে নামা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের চিৎকারে। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত কিশোর-তরুণদের রক্তে যখন পিচ ঢালা পথ ভেসে যাওয়ার উপক্রম, তখন চারুকলার সেই সংবেদনশীল মন আর সিসিমপুরের ইকরিকে গড়া শিল্পী স্থির থাকতে পারেননি। ফেসবুক লাইভে এলেন নওশাবা।
আকুল কণ্ঠে বললেন ‘৫২ আর ‘৭১-এর বীরত্বের কথা, পাশে দাঁড়াতে বললেন দেশের মানুষকে। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, সেই ১৩ মিনিটের আবেগঘন আকুতি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে পরিণত হবে এক মহা অপরাধে।
তারপর শুরু হলো বিভীষিকা। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উধাও হয়ে গেল তার ভার্চুয়াল উপস্থিতি, হ্যাক হলো আইডি। আর রাতের আঁধারে দরজায় কড়া নাড়ল যমদূতের মতো কালো পোশাকের দল। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথের সেই মানবিক কণ্ঠস্বরকে করে তোলা হলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘গাদ্দার’ আর ‘গুজবের রানী’। চার দিনের রিমান্ড, স্যাঁতসেঁতে কারাগারের প্রকোষ্ঠ, আর সবচেয়ে ভয়াবহ—চোখে কালো কাপড় বেঁধে ২১ দিন ধরে অচেনা এক গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া। চোখ বাঁধা অবস্থায় যখন শুধু বুটের শব্দ আর ভারী দরজার কপাট খোলার আওয়াজ শোনা যেত, প্রতি সেকেন্ডে নওশাবার মনে হতো—এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাসটুকু কেড়ে নেয়া হলো।

এর পর আদালতে দেখা গেল এক বিধ্বস্ত নওশাবাকে। পাঁচ হাজার টাকার মুচলেকায় জামিনে মুক্তি তো মিলল, কিন্তু যে জেলখানা থেকে বের হলেন, তার জন্য বাইরের দুনিয়াটি হয়ে উঠেছিল আরো এক অন্ধকূপ। সমাজের চেনা মানুষেরা রাতারাতি পর হয়ে গেল। যে আত্মীয়-স্বজন, যে ভাইদের জন্য রক্তের টান ছিল, তারাও এই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ ট্যাগ পরা মেয়েটিকে নিরাপদ মনে করল না। নিজের ঘরেই ঠাঁই হলো না তার। পরবর্তী ছয় বছরে প্রায় ২০ বারেরও বেশি তাঁকে বাসা বদলাতে হয়েছে। ছদ্মনামে, বোরকা পরে, বন্ধুর পরিচয়ে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। যে সংসার তিনি গড়েছিলেন বহু যত্নে, সেই সংসারের সুতোও ছিঁড়ে গেল এই আতঙ্কের ঝড়ে। ট্রমার গভীরতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অনেক সময় নিজের একমাত্র মেয়েকেও চিনতে পারতেন না তিনি। অ্যাকুরিয়াম থেকে তুলে ডাঙায় আছড়ে ফেলা মাছের মতো ছটফট করতেন নিঃশব্দে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কখনো ‘সিন্ডিকেট’-এর অংশ না হওয়া শিল্পীর ভিতরের সেই আগুন নেভেনি। মূলধারার বিনোদন জগত তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তাকে রাখা হয়েছিল অলিখিত কালো তালিকায়। কিন্তু নওশাবা জানতেন, সত্যের উচ্চারণ করার জন্য যে দাম তিনি দিয়েছেন, তার জন্য কারো কাছে করুণা ভিক্ষা চাওয়া যাবে না। এর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। নওশাবার জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস। তবে এটা ঠিক যে, এর পরও নওশাবা যে খুব একটা কাজ করতে পেরেছেন— তা নয়। বরং ঢাকাই মিডিয়ার চিরাচরিত ‘সিন্ডিকেট’-এ তিনি অনেকটাই ব্রাত্য।
এমন অন্ধকারের মাছেই তিনি আলো খুঁজে পেলেন থিয়েটারের নিভৃত চত্বরে। ঢাকার কোলাহল ছেড়ে তিনি চলে গেলেন প্রান্তিক বাংলায়— রংপুর, রাজশাহীতে। সেখানে গিয়ে তরুণদের সংগঠিত করলেন, শেখালেন অভিনয়ের ব্যাকরণ। নিজের ভেতরের ক্ষতকে সারাতে তিনি আশ্রয় নিলেন থিয়েটারের নিরাময় শক্তিতে। গঠন করলেন নিজের থিয়েটার গ্রুপ, শুরু করলেন ‘ধরণীর গান’-এর মতো ভিন্নধর্মী প্রকল্প। সেখানে কোনো তথাকথিত তারকা নেই; সেখানে একসঙ্গে মঞ্চ আলো করে দাঁড়ায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ, অটিস্টিক শিশু আর সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধরা। সমাজ যাকে অবহেলা করে দয়ার পাত্র বানাতে চায়, নওশাবা তাদের হাতে তুলে দিলেন শিল্পের মশাল।

অবশ্য অন্ধকার সেই সময় থেকে ফেরার পর নওশাবাকে ছোট বা বড় চরিত্রে নিজের দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’, ‘ষ’, ‘বরফ কলের গল্প’ কিংবা ‘ছায়াবৃক্ষ’ ও ‘চন্দ্রাবতী কথা’র বা সর্বশেষ ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’-এর মতে চলচ্চিত্রে যখন আবার তার সাবলীল অভিনয় দেখে দর্শকরা থমকে দাঁড়ায়, কিংবা সম্প্রতি ‘সোমেশ্বরী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে যখন তিনি নিজেকে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন—তখন বোঝা যায় এই আলো সহজে নিভে যাওয়ার নয়। তিনি আজও রিহার্সাল থেকে বের হয়ে পকেটে গাড়িভাড়ার টাকা না থাকার অনিশ্চয়তায় ভোগেন, আজও বছরে একটার বেশি থিয়েটার শো করার জন্য স্পন্সর পান না, কিন্তু তার চোখ দুটোতে এখন আর কোনো ভয় নেই।
বাবার শেখানো সেই পরম সত্যকে নওশাবা ধারণ করে আছেন হৃদয়ে— ‘সবাই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে পারে না।’ তিনি আয়না ধরেছেন সমাজের সামনে, তাই সমাজ তাকে অপছন্দ করেছে। কিন্তু তিনি বদলাননি নিজেকে, বদলাবেনও না। কারণ তিনি জানেন, ঝড়ের মুখে যে বৃক্ষ নোয়াতে জানে না, সেই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। কালো অধ্যায়ের বিভীষিকা কাটিয়ে, বর্তমানের কঠিন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করে নওশাবা প্রমাণ করেছেন— তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী নন; ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বারবার জন্ম নেয়া ফিনিক্স পাখি।






