Select Page

শুধু অভিনয়ই করেছেন আনোয়ার হোসেন, চাননি দুই নৌকায় পা রেখে ডুবতে

শুধু অভিনয়ই করেছেন আনোয়ার হোসেন, চাননি দুই নৌকায় পা রেখে ডুবতে

১৯৫৬ সালে সিনেমায় যাত্রা শুরু আনোয়ার হোসেনের। তারপর নায়ক থেকে চরিত্রানেতা— পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কয়েকশ ছবিতে এবং শতাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির মাধ্যমেই তিনি দেশে বিদেশে প্রচুর সুখ্যাতি পাত করেছেন। পরে দেশ-বিদেশের মঞ্চে এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন শত শতবার। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

কয়েক দশক আগের এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যারিয়ার ও নানা অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন আনোয়ার হোসেন। সেখানে বিদেশী সিনেমার সঙ্গে দেশীয় নির্মাণের পার্থক্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিদেশী ছবির সাথে আমাদের ছবির পার্থক্য অনেক। তারা একটা ছবি করার জন্য লাখ লাখ ডলার রায় করে এবং তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নতমানের ছবি তৈরি করে। তাছাড়া ওদের বাজার বিশ্বব্যাপী আর আমাদের বাজার সীমিত। যে কারণে তাদের ছবির বায় বেশি এবং মানও উন্নত। আর অভিনয়ের মানের দিক থেকে আমাদের দেশ তাদের থেকে একেবারেই পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশেও ভালো ভালো শিল্পী আছে যাদের অভিনয় মান উন্নত।’

বিদেশের মাটিতে অভিনয়ের স্মরণীয় স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘“পালঙ্ক” ছবির শুটিং করার সময় আমার একটি দৃশ্যের অভিনয় দেখে প্রয়াত সত্যজিৎ রায় আমাকে ৫ মিনিটের মতো বুকে অড়িয়ে রাখেন। সেদিন সেটে উৎপল দত্তসহ আরো অনেকে অবাক হয়ে এ দৃশ্য দেখেছেন। যা ছিল আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন।’

আরেক অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ‘একবার বিদেশ থেকে আসার পথে বিমানে আমাকে এক স্টুয়ার্ড বললো— আপনার অভিনীত ‘বড় ভাই’ ছবিটি আমি দেখেছি। ঐ ছবিতে আপনার চরিত্রের মতো আমার ছোট ভাই-বোনেরাও আমাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট দিয়েছে, আমি আপনার সে চরিত্রের ত্যাগের কথা স্বরণ করে ভাই-বোনদের আঘাত সহ্য করে যাচ্ছি। যখনই তারা আমাকে কোনভাবে কষ্ট দেয় তখনি আমি আপনার কথা স্মরণ করি। আপনি যেভাবে বৈর্য ধরেছেন, কষ্ট করেছেন আমিও তা অনুকরণ করে যাচ্ছি। আপনার কথা আমি কখনো ভুলতে পারবো না।’

অভিনয়ের সুখ্যাতি সত্ত্বেও নিজেদের কোনো ছবি পরে দেখতেন না বলে জানান আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আসলে আমি আমার অভিনীত কোন ছবি দেখি না। যেটুকু দেখি তা ঐ ডাবিং রুমে। ওগুলো দেখে আমি কখনও তৃপ্ত হতে পারি না। মনে আফসোস জাগে, কষ্ট লাগে। নিজের কাছে প্রশ্ন করি- এটা—আমি কী করলাম, এটা এমন না হয়ে অমন হলে তো খুব ভালো হতো। আর টিভি নাটকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে মাঝে মাঝে বাসায় থাকলে টিভি নাটক দেখা হয়ে যায়। তখন ঐ একই অবস্থা হয়। আসলে আমার অভিনয় নিয়ে আমি কখনো তৃপ্ত নই। মনে হয়— মনের মত কোন অভিনয় এখনো করতে পারিনি।’

নিজের পছন্দের চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘আমি রাজা বাদশা থেকে রিকশাওয়ালা-মেথর চরিত্রে পর্যন্ত অভিনয় করেছি। এ সবগুলোই আমার কাছে সমান। কোনটিই আমার অপছন্দের নয়। তারপরও মনে হয় মনের মতো চরিত্রে এখনো অভিনয় করতে পারিনি।’

আমরা কি ধরে নিতে পারি নবাব সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রের মাধ্যমে আপনি দর্শক মনে স্থান করেনিয়েছেন। এবং এটিই আপনার জীবনের উল্লেখযোগ্য চরিত্র— এমন মন্তব্যে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি বলবো না।’

চরিত্র বাছাই প্রসঙ্গে এ কিংবদন্তি বলেছিলেন, ‘আমি আসলে অভিনয়ের বাছ-বিচার কখনো করিনি। কেউ আমার কাছে ছবির অফার নিয়ে আসলে আমি সেখানে আমার চরিত্র কী হবে তাই জেনে নিয়েছি এবং পরিচালকের ইচ্ছা মতো অভিনয়ের চেষ্টা করেছি।’

হাল আমলের চলচ্চিত্র আর আপনাদের যুগের চলচ্চিত্র এ দুয়ের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বলা যায় বর্তমান চলচ্চিত্র অপসংস্কৃতিতে তরে গেছে— এমন মন্তব্যে আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, ‘মোটেই তা নয়। এটা হলো যুগের চাহিদা। এক সময় এ দেশের নায়িকারা লম্বা হাতার ব্লাউজ আর শাড়ি পরে অভিনয় করতো কিন্তু এখন এখনতো ঐগুলো অচল। এখন আপনি বোরখা পরিয়ে ছবি তৈরি করলে সে ছবি কেউ কি দেখবে। কেউ দেখবে না। সুতরাং যুগের প্রয়োজনে আধুনিক ছবি তৈরি করতে হচ্ছে।’

আনোয়ার হোসেন অভিনয় ছাড়া জীবনের আর কিছু করেননি। কারণ তার ভাষ্য— অভিনয়ের বাইরে আমি কিছু করি না। দুই নৌকায় পা রাখলে শেষে ডুবে মরতে হয়।

জীবন সম্পর্কে তার একান্ত উপলব্ধি হলো, ‘সদা সত্য কথা বলবে কদাচ মিথ্যা বলিও না। এ উক্তির আলোকে যে জীবন পরিচালিত করবে সেই জগতে শান্তি খুঁজে পাবে। জগতের শান্তি অর্থে নয় বরং মনে। সত্যকে এ জীবনের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমাদের প্রকৃত শাস্তি নিশ্চিত হতো।’

আনোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ইউনিয়নের সরুলিয়া গ্রামে। পরিচালক মহিউদ্দিনের তোমার আমার (১৯৬১) ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান প্রথমে। এতে তিনি খলচরিত্রে অভিনয় করেন। একই বছর তার অভিনীত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র সূর্যস্নান-এ মুখ্য অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জোয়ার এলো (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), নাচঘর (১৯৬৩), দুই দিগন্ত (১৯৬৬), বন্ধন (১৯৬৪), একালের রূপকথা (১৯৬৫) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেন। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে নিগার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে কাদের লাঠিয়াল চরিত্রে অভিনয় করেন। এই কাজের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আয়োজনে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি আমজাদ হোসেনের গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন এই সম্রাট মারা যান ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর।


Leave a reply