শাকিব খানকে ৭০ লাখ টাকার রোলেক্স উপহার—আমাদের স্পেকট্যাকল অব ডেকাডেন্স
শাকিব খানকে ৭০ লাখ টাকার রোলেক্স উপহার দিয়েছেন ফরিদুর রেজা সাগর ও চ্যানেল আই। ভালো হইল না মন্দ হইল, এই নিয়া একটু আলাপ করা যাক।
পক্ষের কথাটা সহজ হবে। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তারা যারে ইচ্ছা উপহার দিতে পারে, যেখানে ইচ্ছা খরচ করতে পারে। একজন শিল্পীরে তারা সম্মান দিছে, এতে কার কী।

বিপক্ষের কমন কথাটাও সহজ, একটু মার্ক্সবাদী টোনে। যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের গড় আয় এই ঘড়ির দামের ভগ্নাংশ, সেই দেশে এক গণমাধ্যম, যে নিজেরে কৃষি আর মানুষের গণমাধ্যম বইলা দাবি করে, ক্যামনে এত টাকার উপহার দেয়, এটা দৃষ্টিকটু।
আমি এই দুই লাইনের বাইরে গিয়া দেখব। নিজেরে নীটশের দুই শিষ্য বানাইয়া আমার লগেই আমার এই বাতচিত।
প্রথম কথা, এই উপহার কোনো গোপন ব্যক্তিগত উপহার নয়। এটা প্রকাশ্য, অনুষ্ঠান কইরা দেখানো, ক্যামেরায় ধরা, সম্প্রচারিত। সাগর মনে মনে কী চাইলেন, সেইটা আমার বিচার্য না। আমি দেখব উপহারটা যেভাবে মঞ্চস্থ হইল। এই মঞ্চায়নই খরচটারে প্রদর্শনযোগ্য আর উদযাপনযোগ্য বানাইছে। এই ফর্মটার নাম স্পেকট্যাকল, দেখানোর জন্য সাজানো দৃশ্য।
আর এই দৃশ্যটা কীসের দৃশ্য, সেইটার নাম দিলাম ডেকাডেন্স, রুচির নগ্ন পতনের দৃশ্য।
শিল্পী আর শিল্পরে সম্মান দেওয়ার আরো অনেক ভালো পন্থা আছে। তার কাজ নিয়া গভীর আলোচনা এর একটা প্রধানতম কাজ। পিছাইয়া থাকা শিল্পী আর শিল্পরে দাঁড় করানোও শিল্পরে সাহায্য করার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু একটা মহামূল্যবান ভোগ্যপণ্য কব্জিতে তুইলা দিয়া তার ভিডিও ছড়ানো, এইটা সম্মান না, এইটা পশুপালের করতালি পাওয়ার বাসনা। নীটশের জরাথ্রুস্ট যে চোখ-পিটপিট-করা শেষ মানুষের কথা বলে গেছেন, যে নিজের মূল্য টের পাওয়ার জন্য ভিড়ের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী থাকে সব সময়, এই উদযাপন ঠিক সেই মানুষের সংস্কৃতি। মহত্ত্বের কোনো আকাঙ্ক্ষা নাই তাদের, আছে একটা ভোগের জিনিসরে ঘিরে গণ-উল্লাস। স্পেকট্যাকলটা যখন এই জিনিসরে কেন্দ্র কইরা ঘোরে, তখনই সেইটা স্পেকট্যাকল অব ডেকাডেন্স।

বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ অনেকদিন ধইরা যে জিনিসটা চলতেছে, ভোগ আর ধন-সম্পদের প্রদর্শন, সাথে আবার মাপা মাপা বিনয়, এই সংমিশ্রণটা আভিজাত্য না, আভিজাত্যের ভাণ। নব্য-ধনীর কুৎসিত প্রদর্শন। এরা আভিজাত্য মাপে জিনিসের দাম আর ব্র্যান্ড দিয়া। চ্যানেল আই এই পথেই হাঁটছেন।
এই জায়গাতেই নীটশের শিষ্য আমার অন্য অংশ প্রশ্ন তুলতে পারেন। বিশাল, উপচে পড়া, জমকালো দান তো অভিজাতই হইতে পারে। শক্তিমানরে সম্মান দেখানো, প্রাচুর্যের উদারতা।
এর উত্তরে বলব, হ্যাঁ, অবশ্যই পারে। বিলাস খরচে আমার আপত্তি নাই। কেন গরীবরে দিল না, এই যুক্তিতে আমার কোন অভিযোগও নাই।
কিন্তু শর্ত একটাই, সত্যিকারের আভিজাত্য তার মূল্য পায় নিজের ভিতর থেকে, কোনো জিনিস তারে মূল্য দেয় না। এইখানে ঘটল উল্টাটা, একজন শিল্পীর সম্মান মাপা হইতেছে একটা সুইস ব্র্যান্ডের দামের অঙ্ক দিয়া।
যে সংস্কৃতি আর অন্তর্নিহিত শ্রেষ্ঠত্ব চিনতে পারে না, তাই শ্রেষ্ঠত্বরে মূল্যট্যাগ দিয়া কিনতে চায়, এইটাই রুচির পতন। সাগর আর চ্যানেল আই এই পতনটাই উদযাপন করলেন।
দান নীটশের জরাথ্রুস্টের কাছে সর্বোচ্চ গুণ, যা উপচে পড়া প্রাচুর্য থেকে সোনার মতো নিজেরে বিলায়।
আমার ভিতরের অন্য শিষ্য আবার বাধা দেন, তাইলে এই দানরে কেন মহানুভবতা বলব না আমরা? গর্বভরে নিজের উপচে পড়া দেখানই তো আভিজাত্য, “দেখো আমি কী বিলাইতে পারি” তো দানশীল গুণেরই ভঙ্গি।
বলব না কারণ এখানে বুঝার মত সূক্ষ্ম এক বিষয় আছে। পার্থক্যটা গ্রহীতা কী পাইল তাতে না, পার্থক্যটা দাতা কী বিলাইতেছে তাতে। আভিজাত্যের দানে ঝলকায় দাতার নিজের গোল্ড, তার নিজের সৃষ্ট মূল্য, রূপ পাইয়া বাইর হইয়া আসা বস্তু। আর এইখানে ঝলকাইতেছে রোলেক্সের মূল্য, কেনা মূল্য, ধার-করা ঝলক। সাগরের নিজের কোনো গোল্ড নাই বিলানোর, তাই তিনি একটা সুইস ব্র্যান্ডের দামের ট্যাগরে নিজের মহানুভবতা বইলা চালাইতেছেন।
এইজন্যই “দেখো আমি কী বিলাইতে পারি” এইখানে আর গর্ব না, ভান। কারণ যা প্রদর্শিত হইতেছে তা ক্রয়ক্ষমতা, নীটশীয় তালিকায় সবচেয়ে নিচু শক্তি, যা পশুপাল আর নব্য-ধনীরই থাকে, অথচ সেইটারে আভিজাত্যের আত্ম-প্রাচুর্যের ছদ্মবেশ পরানো হইতেছে। ভুল ধরনের শক্তি, ঠিক ধরনের শক্তির মুখোশে। প্রাচুর্যের দান নয় এইটা বরং প্রাচুর্যের ভানে আত্মপ্রচার।
আর একটা প্রভাবশালী মিডিয়া যখন নিজেই এই কালচারাল ডেকাডেন্সের স্পেকট্যাকলে নেতৃত্ব দেয়, তখন জাতির আশা কী থাকে?
কয় বছর আগে আমাদের সংস্কৃতির অভিভাবকরা ঘোষণা দিছিলেন, দেশে রুচির দুর্ভিক্ষ চলতেছে। মামুনুর রশিদেরা আঙুল তুলছিলেন নিচের দিকে, হিরো আলমের দিকে, এক প্রান্তিক বাইরের লোক, যার উত্থানরে তাঁরা বলছিলেন কুরুচি আর অপসংস্কৃতির উত্থান। দুর্ভিক্ষটা তখন আসছিল নিচের তলা থেকে।
কিন্তু আসল রুচির পতন, শিল্পীর সম্মানরে সুইস ব্র্যান্ডের দামে মাপা, সেইটা তো আসতেছে উপর থেকে, খোদ প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। এবার নিশ্চয়ই মামুনুর রশিদেরা আবার সভা ডাকবেন, আর বলবেন, রুচির দুর্ভিক্ষ এইবার মহামারীতে পরিণত হইছে ফরিদুর রেজা সাগরের হাত ধরে।
হাহা। পারবেন কি?






