‘কাগজের নৌকা’র ষাট বছর— যেভাবে প্রেরণা হয়ে আছেন অভিনেত্রী ও ব্যক্তি সুচন্দা
১৯৬৬। বাঙালি জাতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার বছর। রাজনৈতিক বাঁকবদলের বছর। ৬ দফা ঘোষণার বছর। চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও ১৯৬৬ মাইলফলক। সুচন্দার আবির্ভাবের বছর। রাজ্জাকের নায়ক হওয়ার বছর। সুচন্দা, রাজ্জাক ও জহির রায়হানের যূথবদ্ধ হওয়ার বছর। পরবর্তী সময়ে এই তিন গুণী শিল্পী জাতিকে নিবেদন করেন বাঙালি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর ‘জীবন থেকে নেয়া’।

কাগজের নৌকা চলচ্চিত্রে আখতার ও সুচন্দা
৫ আগস্ট, ১৯৬৬। আজ থেকে ৬০ বছর আগে এই দিনে মুক্তি পায় ‘কাগজের নৌকা’। সামাজিক ছবি। পরিচ্ছন্ন ছবি। বিনোদন ছবি। ষাটের দশকের রুচিশীল দর্শকদের জন্য আদর্শ ছবি। এর আগে ‘সুতরাং’ ছবিতে সুভাষ দত্ত তৈরি করেন কবরীকে। ‘কাগজের নৌকা’য় এই নির্মাতা নায়িকা বানান সুচন্দাকে। তার বিপরীতে অভিনয় করেন হাসান ইমাম ও আখতার হোসেন। এখন তাদের পরিচিতি চরিত্রাভিনেতা হলেও তখন তারা নায়ক ছিলেন।
সুচন্দা সাধারণ ঘরের তরুণী। বাবা সরকারি কর্মচারী। মা সংস্কৃতমনা। তিনি হোমিওপ্যাথি পড়েছেন। অল্পবয়সে তার একটি মেয়ে মারা যায়। মেয়ের মৃত্যুর পর তিনি দর্শনীর বিনিময় ছাড়া গ্রামের সহায়হীন মানুষদের চিকিৎসা করতেন। তিনি চাইতেন—তার মেয়েদের মধ্যে কেউ চিকিৎসক হোক। সুচন্দার মায়ের ইচ্ছে বাস্তবে পূরণ না হলেও পর্দায় হয়েছে। প্রথম ছবিতেই তার ভূমিকা একজন চিকিৎসকের।
‘কাগজের নৌকা’র এই সালেহা চরিত্রটি সম্পর্কে ছবির কাহিনিকার রোমেনা আফাজ বলছেন—’কাগজের নৌকার কাহিনি গড়ে উঠেছে একটি বলিষ্ঠ মেয়ের জীবন চরিত্র নিয়ে। সেই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমার কাহিনির সার অংশ। আমার কাহিনির মূল উদ্দেশ্য প্রেম বা ভালবাসা নয়। তবে প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আমাকে এসব সংযোজন করতে হয়েছে। দারিদ্র্য ছিল আমার নায়িকার আলোর ভূষণ। দারিদ্র্য তাকে করে তুলেছিল সংযমশীলা। দারিদ্র্যই তাকে নিয়ে যেতে সহায়ক হয়েছিল তার চলার পথে। দারিদ্র্যই তাকে ডাক্তার হতে সক্ষম করেছিল। সবের মূলে ছিল তার সাধনা—সে ডাক্তার হবে। সাধনা-সংযমই আমার নায়িকার সমস্ত সত্তাকে লুপ্ত করে রেখেছিল। যেখানে আর একজন পুরুষের আবির্ভাব ঘটেও নায়িকার মনে যে রেখাপাত করতে সমর্থ হয়নি। আমার নায়িকার সাধনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল। আমার নায়িকা জয়ী হয়েছে, এটাই আমার নায়িকার কৃতিত্ব।’

রহস্যকাহিনি রচয়িতা রোমেনা আফাজের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে ৬টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—কাগজের নৌকা (১৯৬৬), মোমের আলো (১৯৬৮), মায়ার সংসার (১৯৬৯), দস্যু বনহুর (১৯৭৬), মধুমিতা (১৯৭৮), মাটির মানুষ (১৯৭৯)। ‘দস্যু বনহুর’ মুক্তির সুবর্ণজয়ন্তী হচ্ছে চলতি বছর। ১৩৮টি বইয়ে সমাপ্ত ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ একসময় ছিল বেস্টসেলার। ২০২৬ সাল রোমেনা আফাজের জন্মশতবর্ষ। তার বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৩ বছর বয়সে। দুই কন্যা ও সাত পুত্রের জননী ছিলেন তিনি। জীবন অতিবাহিত করেছেন মহানগর থেকে দূরবর্তী মফস্বল শহর বগুড়ায়। জলেশ্বরীতলার বাড়িতে কেটেছে তার মধ্যবিত্ত-জীবন। তার বইয়ের প্রকাশক রাজধানীর মূলধারার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। পরিবার পরিচালিত বগুড়ার সাহিত্য কুটির প্রকাশনা সংস্থা এসব বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনের দায়িত্ব পালন করে। এমন প্রান্তবর্তী এক নারীর নিজস্ব সাহিত্য ভুবন তৈরির ঘটনা খোদ সৃজনশীল জগতে এক রহস্য।
রোমেনা আফাজ ও সুচন্দা দুজনেই বলিষ্ঠ বাঙালি নারী। তারা সাহিত্যে ও সেলুলয়েডে শক্তিশালী নারী চরিত্র উঠিয়ে এনেছেন। সুচন্দার দ্বিতীয় ছবি ‘বেহুলা’। এটি বাংলা সাহিত্যের তথা মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র। ভালোবাসা, সাহস ও অধ্যবসায়ের জন্য লোকসংস্কৃতিতে অমর হয়ে আছে বেহুলা। এটি কেবল একটি পৌরাণিক চরিত্র নয়, বাঙালি নারীর সাহস, নিষ্ঠা ও আশার এক চিরন্তন প্রতিমূর্তি। রূপালি পর্দায় বেহুলার চরিত্র রূপায়ণ করে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন সুচন্দা।
১৯৬৬ সালের ২৮ অক্টোবর মুক্তি পায় ‘বেহুলা’। সেই হিসেবে জহির রায়হানের এই কালজয়ী সৃষ্টির হীরকজয়ন্তী হচ্ছে ২০২৬ সালে। আর্ট আর কমার্সের গাঁটছড়ায় তৈরি এই ছবি মুক্তির পরপরই দর্শক-সমালোচকের তুমুল করতালিতে অভিনন্দিত হয়। এই ছবি থেকে নির্মাতা হিসেবে জহির রায়হানের প্রাপ্তি বক্স অফিসের অঢেল আশীর্বাদ। ইন্ডাস্ট্রির প্রাপ্তি নতুন একজন নায়ক—রাজ্জাক। আর সুচন্দার প্রাপ্তি বেহিসেবী প্রশংসা। অভিনেত্রী হিসেবে যেমন বন্দিত হন, তেমনই নন্দিত হন নায়িকা হিসেবে। এখান থেকে তার ক্যারিয়ারের নৌকা বেহুলার ভেলার মতোই উজানে ভাসতে শুরু করে…।
ষাটের দশকের শেষটা জুড়ে সিনেমায় সুচন্দার দুর্দান্ত দাপট। কিছু ছবি তার ‘সুপারস্টার’-এর’ মর্যাদা রক্ষা করে। কিছু ছবি তাকে ‘অ্যাক্ট্রেস’-এর স্বীকৃতি দেয়। আবার কিছু ছবি একই সঙ্গে তাকে যেমন জনপ্রিয় করে তোলে, তেমনই তার শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটায়।

কাজী জহিরের ‘নয়নতারা’ (১৯৬৭) এমনই একটি ছবি। শহরে, বন্দরে এই ছবি সুচন্দার নামে জয়ধ্বনি তোলে। একজন অভিনেত্রীকে বাঁচিয়ে রাখতে খুব বেশি ছবির দরকার পড়ে না। ‘নয়নতারা’ তেমন একটা ছবি হয়ে ধরা দেয় সুচন্দার ফিল্মোগ্রাফিতে। এরপর বলতে হবে রহিম নওয়াজ পরিচালিত ‘মনের মতে বউ’ (১৯৬৯) ছবির কথা। জহির রায়হান ও খান আতাউর রহমানের স্পর্শধন্য এই ছবি সুচন্দার জীবনকে সোনার আলোয় ভরিয়ে দেয়। ছয় দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও এই ছবির গান-গল্প সিনেমার ইতিহাসের গালগল্প হয়ে টিকে আছে।
কারিগরের পরিচালনায় রাজ্জাকের সঙ্গে ‘সখিনা’ (১৯৬৮), জহির চৌধুরীর পরিচালনায় আজিমের সঙ্গে ‘পরশমণি’ (১৯৬৮), মমতাজ আলীর পরিচালনায় সরকার কবীরউদ্দিনের সঙ্গে ‘নতুন নামে ডাকো’ (১৯৬৯) ছবিতে সুচন্দার অভিনয় প্রশংসিত হয়। ছবিগুলো আলোচিত হয় নির্মাণশৈলী, নতুন চিন্তা আর স্রোতের প্রতিকূলে নৌকা ভাসানোর জন্য।
সুচন্দার অভিনয়জীবনে সেরা ছবিটি অবশ্য আসে তারই স্বামী জহির রায়হানের কাছ থেকে। ‘বেহুলা’র পর জহির রায়হানের পছন্দের শিল্পীর তালিকায় ঢুকে যান সুচন্দা। একসময় প্রিয়জনের খাতায়ও নাম উঠে যায়। ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের পরিচালনায় ‘আনোয়ারা’ ছবিতে অভিনয় করেন সুচন্দা। গ্রাম্যবধূর চরিত্রে তার অভিনয় মনে ধরে সমালোচকদের। এ ছাড়া সিনে ওয়ার্কশপের কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। জহির রায়হান ও তার সৃজনশীল সহযোদ্ধাদের তৈরি এই শিবির থেকে একাধিক সফল ছবির দেখা পান সুচন্দা।
১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন মুক্তি পায় বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’। তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহশিল্পী রাজ্জাককে এই ছবিতে পান সুচন্দা। পরিচিত গণ্ডির সব শিল্পী—খান আতা, আনোয়ার হোসেন, আমজাদ হোসেন, রোজী, রওশন জামিল, বেবী জামান—ছিলেন একফ্রেমে। প্রেমিকা থেকে মা—চিরন্তন এক বাঙালি নারীর চরিত্র বিথী। তাতে সার্থক অভিনয় করে বাংলা সেলুলয়েডের ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেন সুচন্দা।

১৯৭২ সালে জহির রায়হানের অন্তর্ধানের পর সুচন্দা এক সুদীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। দুই পুত্র তপু রায়হান ও অপু রায়হান হয়ে ওঠেন তার জীবনের অবলম্বন। সংগ্রাম, অশ্রু দিয়ে লেখা, বিচার, কথা দিলাম, মধুমিলন, ধীরে বহে মেঘনা, কলমীলতা, সবুজ সাথী, চ্যালেঞ্জ, চন্দ্রনাথসহ অনেক বিখ্যাত ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন সুচন্দা। কিন্তু ষাটের দশকের কাজলটানা চোখের সুচন্দার সঙ্গে তুলনীয় নয় এই পর্যায়ের ক্যারিয়ার। শিল্প, ব্যবসা, আলোচনা, সৃজনশীলতা—সব মিলিয়ে তার সোনালি সময় ছিল বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামে মুখর সেই দিনগুলো।
আশির দশকে সুচন্দার নব-অবতার দেখা যায়। ১৯৮৫ সালে নিজের প্রযোজনায় ‘তিন কন্যা’ ছবিতে দুই বিখ্যাত নায়িকা বোন—ববিতা ও চম্পার সঙ্গে পর্দায় আসেন সুচন্দা। ১৯৯৩ সালে ‘প্রেম-প্রীতি’ ছবিতে তার প্রযোজনায় নায়ক হন ছেলে তপু রায়হান। ২০০৪ সালে জহির রায়হানের উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ পরিচালনা করে নতুন পরিচয়ের স্বীকৃতি পান সুচন্দা। অনবদ্য পরিচালনার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আর ‘হাজার বছরে ধরে’ পায় শ্রেষ্ঠ সিনেমার সম্মানসহ একাধিক পুরস্কার। ২০১৯ সালে চলচ্চিত্রে সামগ্রিক অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা।
১৯৬৬ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট—৬০ বছর ধরে এই দেশের সংস্কৃতির জন্য কাজ করে চলেছেন এই প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেত্রী। পর্দায় যেমন তার সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়েছে, তেমনই বিচ্ছুরিত হয়েছে তার অভিনয়ের শক্তি। পর্দার পেছনে নির্মাতা হিসেবেও তিনি পরিচয় দিয়েছেন শক্তিমত্তার। পর্দার বাইরে একজন সংগ্রামী ও লড়াকু নারীর প্রতিচ্ছবি সুচন্দা। এই দেশের ছুটে চলা নারীদের জন্য তিনি প্রেরণার উৎস।






