Select Page

‘মুখ ও মু্খোশ’ : স্বপ্নের সিনেমা

‘মুখ ও মু্খোশ’ : স্বপ্নের সিনেমা

প্রথম প্রেমে পড়ার পর অনুভূতি হয় স্বপ্নের মতো।
প্রথম সন্তান মা-বাবার কাছে স্বপ্নের মতো।
প্রথম সৃষ্টিশীল কিছু শিল্পস্রষ্টার কাছে স্বপ্নের মতো।
একইভাবে প্রথম সিনেমাও নির্মাতার কাছে স্বপ্নের মতো।

ঢাকার প্রথম সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তি পেয়েছিল। একজন মহামান্য নির্মাতা আব্দুল জব্বার খান তাঁর চ্যালেঞ্জকে বাস্তবে রূপ দিতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি প্রযোজক এফ দোসানিকে জবাব দিতে নির্মাণ করেন সিনেমাটি। দোসানির বক্তব্য ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়া সিনেমা নির্মাণের উপযুক্ত নয়।’ তার কথার জবাব দিতে জনাব আব্দুল জব্বার খান নিজেই সিনেমা নির্মাণ করে দেখিয়ে দেন। তাঁর হাত ধরে আমাদের আজ পর্যন্ত সিনেমা নির্মাণ চলছে।

আব্দুল জব্বার খান যে সৎ সাহসের পরিচয় দিয়ে পূর্ব বাংলার প্রথম সবাক সিনেমা নির্মাণ করেছেন সেটাই ছিল এ বাংলাদেশের সিনেবিপ্লব। সেটাই সাহসিকতার প্রথম উদাহরণ। তাঁকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমাটি পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের নিজের রচিত নাটক ‘ডাকাত’ এর সিনেমাশিল্প হিসেবে রূপদান। প্রথমে নাটকের নামানুসারে ‘ডাকাত’ নামই রাখতে চেয়েছিলেন নির্মাতা পরে কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের পরামর্শে ‘মুখ ও মুখোশ’ রাখেন। এটাও একটা বিরল উদাহরণ নাটক থেকে সিনেমা নির্মাণ। এ সূত্রে literature term-এ ‘art for art’s sake’ বা ‘কলাকৈবল্যবাদী’ মতবাদের কথা বলা যায়। এটি বিশ্লেষণ করে শিল্প থেকে শিল্প-কে। মানে এক শিল্প থেকে আর এক শিল্পের নির্মাণ। সেদিক থেকে ‘মুখ ও মুখোশ’ একটি সাহিত্যভিত্তিক এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা। আমাদের প্রথম সিনেমাই এক্সপেরিমেন্ট এটা ভাবতেও ভালো লাগে। তার থেকেও অবাক করা বিষয় সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল বাণিজ্যিকভাবে এবং সেই সময়ের বাজারে ৪৮,০০০ রূপি আয় করে। এটা মামুলি ঘটনা নয়।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর গল্পটা খুবই সরল। শমসের ডাকাতের ভয়ে সবাই তটস্থ। এমন সময় রহমান মৃধার প্রথম স্ত্রী রাশিদা আফজাল নামে পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে মারা যায়। দ্বিতীয় স্ত্রী জালাল ও রাশিদা নামে দুটি সন্তানের জন্ম দেয়। একদিন আফজালকে তার সৎ মা পেটায় এতে সে অজ্ঞান হলে মৃত ভেবে কবর দিতে গেলে শমসের ডাকাতের হাতে পড়ে। তার ঘরেই মানুষ হতে থাকে অাফজাল।শমসের ডাক্তার তার ডাকাতি কাজকর্ম চালাতে পুলিশকে ঘুষ দেয়।পরে ডাকাতকে ধরতে সরকারি পুরস্কার ঘোষিত হয়। আফজাল চরিত্রে আব্দুল জব্বার খান নিজেই ছিলেন। ডাকাত ছিলেন অসাধারণ অভিনেতা ইনাম আহমেদ।নায়িকা ছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেনগুপ্তা ও ইডেন কলেজের জহরত আরা।

গল্পটিকে মানবিক করে নির্মাণ করেন নির্মাতা।গল্পের মেসেজ ছিল ‘মুখ ও মুখোশ’ এর একটা প্রতীকী ব্যঞ্জনা। মানুষ মুখে চেনা এক আর তার আড়ালে এক। শাস্তি পেতে হয় তাই ডাকাত ইনাম তার মৃত্যুর সময় পানি পায়নি। আব্দুল জব্বার খান আফজাল চরিত্রে খুব টাচি ছিলেন। নায়িকা পূর্ণিমাকে দেখা গেছে জলের মাঝে ডুবে শাপলা ফোঁটা দিঘিতে গান গাইতে। হ্যাপিনেস বা স্যাডনেস কোনোকিছুর কমতি ছিল না।

সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক দর্শককে আগে থেকে নির্মাতার পক্ষ থেকে সিনেমার সব দায় বলে দেয়ার দিকটি।বলেছেন–‘সমালোচকের দৃষ্টিতে না দেখার অনুরোধ জানাই।’ এ সিনেমা নির্মাণের পেছনে যে ত্যাগ ও পরিশ্রম ছিল সেটিকে স্মরণ করে দেখতে বলা হয়েছে। এটা ছিল প্রথম সবাক সিনেমার free interpretation এর সুবিধা। কারণ সমালোচনাকে ভয় করে বলা হয়েছে এটা না বরং একটা দেশের প্রথম সিনেমাকে উন্মুক্ত চিন্তার জন্য বলে দেয়া। আব্দুল জব্বার খান মঞ্চের শিল্পী তাই প্রফেশনালিজমকে টেকনিক্যালি হ্যান্ডেল করেছেন। একালের নির্মাতা-সমালোচকদের অনেককিছু শেখার আছে মহামান্য আব্দুল জব্বার খানের কাছে।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply