Select Page

দীর্ঘদিনের ‘ট্যাগ’ ভেঙে রাফহান রাফীর চ্যালেঞ্জ ‘প্রেশার কুপার’

দীর্ঘদিনের ‘ট্যাগ’ ভেঙে রাফহান রাফীর চ্যালেঞ্জ ‘প্রেশার কুপার’

রায়হান রাফীকে যারা দীর্ঘদিন ‘নারীবিদ্বেষী’ ট্যাগ দিয়ে অনেকটা আমজনতার ডিরেক্টর, প্রপাগাণ্ডা মেকার, ভাইরাল ঘটনার ডিরেক্টর বিভিন্ন নামে ডাকতেন, তাদের জন্য ‘প্রেশার কুকার’ একটা বড় ধাক্কা। রাফীর জন্য কোরবানির ঈদ লাকি চার্ম। সে রোজায় ছবি এনেছে, নিজে প্রডিউস করেছে, সিনেমায় কোন হিরোটাইপ নাই, অ্যাকশন নাই এবং সবচেয়ে বড় কথা ফিমেইল ওরিয়েন্টেড। এত চ্যালেঞ্জ দেয়ায় সে একটা বড় ‘থ্যাংকস’ পাবে।

মোটাদাগে, রাফীর পর এই সিনেমার জন্য আরো ধন্যবাদ পাবে রাইটার মেহেদী হাসান মুন, সিনেমাটোগ্রাফার জোহায়ের মুসাভভির এবং অতি অবশ্যই নাজিফা তুষি। গানও একটা থেকে আরেকটা সুন্দর, রিপন নাথের স্টক কিছু সাউন্ড বাদ দিলে এই ডিপার্টমেন্ট ভালোই।

গল্প শুধু একজনকে কেন্দ্র করে না। শুরুটা নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা রেশমাকে দিয়েই। ছেলেকে পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকার মাদ্রাসায় হাফেজি পড়তে রেখে রেশমা স্বামীকে খুঁজতে এসেছে ঢাকা নামের প্রেশার কুকারে। ভাইয়ের বাসায় থেকে ভাবির কটূক্তি শুনে আর পুরুষদের ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করে দিন কাটে রেশমার। পার্লারে বান্ধবীর মতো একজন ‘বাড়তি’ আপ্যায়নে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে বেশ ভালো ইনকাম করলেও রেশমা সেসব অক্ষরজ্ঞানে অজ্ঞ। তাই মাসশেষে হাত পাততে হয়। এর পাশাপাশি আছে ড্রাইভারের মেয়ে অনন্যার টিপিক্যাল প্রেম, বাবার বয়স্ক বসের সাথে বিয়ের ঝামেলা আর পলিটিশিয়ানের বউ আজমেরীর নির্যাতন সয়ে করা সংসারের গল্পও।

রাইটার হিসেবে রাইটিং পয়েন্ট অব ভিউটা বলি। সিনেমাকে রাফীর আলোচিত সিনেমাগুলোর নামে ভাগ করা হয়েছে প্রাসঙ্গিকভাবেই। ‘পরাণ’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’ নামে প্রেম, প্রতারণা, রাইজিং আর ক্যাওসকে মেনশন করে ‘প্রেশার কুকার’কে রাখা হয়েছে ‘কর্মা’ হিসেবে। যেকারণে সিনেমার লেন্থ বেশ বড়, কাস্টিং হিউজ এবং স্ক্রিনপ্লে ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহ হয়ে যায়। এটার পজিটিভ দিক ছিল, বাংলা সিনেমার গল্প বলার ধরনে নতুনত্ব আর নেগেটিভ দিক হলো কাস্টিং, প্লেসমেন্ট আর স্ক্রিনপ্লেকে জাস্টিফাই ঠিকঠাক ব্যালান্স বা জাস্টিফাই না করতে পারা। তবে আরামের দিক হল, দর্শক হিসেবে সিনেমা হলে একসাথে অনেকের গল্প এবং সিনেমার ভেতর সিনেমা দেখা যাবে। অন্যদের মতো রাফী এখানে ছেড়ে দেয়া সুতা কোনটা টেনে ক্লাইম্যাক্সে আসতে ভুল করেন নাই, সব সুতাই বোনা হয়েছে। তবে একসাথে টান পড়ায় কয়েক জায়গায় সুতা ঢিলা ছিল, কয়েক জায়গায় গেছে ছিঁড়ে। শেষদিকে জনরা শিফটিং করতে গিয়ে লেন্থ বেড়ে গেছে অনেকটা।

শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘পালাবি কোথায়’ কিংবা তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’কে দারুণভাবে ট্রিবিউট দেয়া হয়েছে। ‘পরাণ’র অনন্যা নামে মারিয়া এখানে আছে ভালবাসার পার্টে, তার বাবা চরিত্রেও সেই শহীদুজ্জামান সেলিম। আছে ‘সুড়ঙ্গ’র পাখিও। ফজলুর রহমান বাবু আছেন ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ হয়ে। চরিত্রে এমন আলাদা মনোযোগ ভালো লেগেছে।

নাজিফা তুষির ক্যারেক্টার পার্লারের মেয়ে রেশমাই হয়ে গিয়েছিলো। রেশমা কিংবা পাখিরূপে তুষি সিনেমার বড় একটা অংশ একাই ক্যারি করেছে। সন্তানের মা, প্রতারিত স্ত্রী, অধিকার হারানো বোন, টাকার নেশায় সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া পার্লার গার্ল কিংবা ভালোবাসা নিয়ে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্নে বিভোর প্রেমিকা – সবখানে তুষি তুষ্ট করেছে। তবে তার চরিত্রের মেজর ট্রান্সফরমেশন টাইমটা খুব তাড়াহুড়া করে চলে গেছে যেটা হজম করতে সময় লাগবে। তবে তুষির আঞ্চলিক ভাষার সাবলীলতা অবাক করেছে। রাফী তুষিকে দিয়ে নারীর পাওয়ার রিভেঞ্জ, ডমিন্যান্স, রাইভালিটি সব দেখিয়েছেন। রেশমা অনেকদিক থেকেই মনে রাখবার মত ক্যারেক্টার।

এরপর রিজভী রিজু, এই বান্দা যখনই পর্দায় এসেছে, দর্শক হয়তো হেসেছে নয়তো মায়া নিয়ে তাকিয়েছে। এমন একটা প্রেমিক সব মেয়েই চাইবে। রিজভীর নীরবতা অনেককে স্তব্ধ করেছে, কান্না অনেককে সিক্ত করেছে।

ভালো করেছে মারিয়া মেহনতি। ছোটপর্দায় কয়েকটা কাজ দেখেছি তার। তবে অনন্যা ক্যারেক্টারে খুব ভালো ছিল। তার কো-অ্যাক্টর ইয়ামিনও সম্ভাবনাময়।

বুবলি ঠিকঠাক তবে তার শেষটা আরোপিত। যেভাবে বুবলিকে একজন উঠতি পলিটিশিয়ান হিসেবে দ্রুত বিল্ডআপ করা হয়েছে, তাতে শেষটা মানানসই না। ফজলুর রহমান বাবু ভালো করবেন, এটা স্বাভাবিক তবে চরিত্রটায় আরো লেয়ার ও স্ক্রিনটাইম দিলে ভালো হতো। অল্পসময়ে চঞ্চল চৌধুরী কমিক রিলিফ দিয়েছেন। ফারজানা ছবি অসাধারণ, অর্গানিক! আইমুন শিমলা এত্ত ন্যাচারাল। তাকে ঝগড়াটে ভাবি হিসেবে যে কেউ বিশ্বাস করবে। চট্টগ্রামের মেয়ে হওয়ায় ডায়লগেও দারুণ স্যুট করেছে। ফরহাদ লিমন, প্রান্তর দস্তিদার ঠিকঠাক। সারপ্রাইজিং কাস্ট ছিল আজিজুল হাকিম, এই বয়সেও দুর্দান্ত!

এবার আসি ওয়েস্ট কাস্টিংয়ে।

রাফীর সিনেমা, তাই বোধহয় অনেকে ‘না’ করতে পারেন নাই। শহীদুজ্জামান সেলিম, মিশা সওদাগর, গাজী রাকায়েত, সুমন আনোয়ার, ফারিহা সেউতি, আরফান মৃধা এক্সপেক্টেড কিছু করতে পারেন নাই। তাদের বাইরে অন্য অনেককে দিয়ে ক্যারেক্টারগুলো করালেও ক্ষতি হতো না। স্নিগ্ধা চৌধুরীকে প্রেসমিট, পোস্টারে ফ্রন্টলাইনে দেখালেও রাকা চরিত্রে আহামরি কোন পারফরম্যান্স দিতে পারেন নাই বা দেয়ার জায়গা ছিল না।

জোহায়ের মুসাভভির ‘রইদ’-এর সিনেমাটোগ্রাফার, যে সিনেমা আসার আগেই ক্যামেরার কাজ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই সিনেমা দেখলেও আলোচনা বাড়বে। সিনেমাটোগ্রাফি খুব খুব ভালো। কিছু দৃশ্য রোলার কোস্টারের মত চলতে থাকা স্ক্রিনপ্লেকে থামিয়ে শান্ত দীঘির পানির মতো আরাম দিয়েছে। শুরু থেকেই কয়েকটা ওয়ান টেইক, লং শট ছিলো টেকনিক্যালি শার্প। ল্যান্ডস্কেইপগুলো চোখ জুড়ানো। কালারের কাজও ভালো হয়েছে।

প্রডাকশন ডিজাইন আরো ভালো করা যেত। পার্লারটা খুব প্রিমিয়াম কোন ফিল দেয় নাই। হোটেল, পার্লার, বাসা একই জোন মনে হচ্ছিলো।

প্রতিটা গান একটার চেয়ে অন্যটা ভালো। লিরিকসও দারুণ। এবারের ঈদের সেরা এলবাম এই সিনেমারই। ‘ও টুনটুনি’ গানটা প্রমোশনে আরো আগে আনলে বড় কোন ক্ষতি হতো না সম্ভবত। রুসলানের বিজিএম মেবি, ভালো।

গালাগালি ও কিছু সেক্সুয়াল সুড়সুড়ির জন্য সিনেমাটা ‘এ’ সার্টিফায়েড। তবে লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, ‘প্রেশার কুকার’র একটা স্মার্ট কাট ভার্সন অস্কারের জন্য যেতেই পারে।

রেটিং: ৭.৫/১০


About The Author

Graduated from Mawlana Bhashani Science & Technology University. Film maker and writer.

Leave a reply