নিজ দলের কাছে অনলাইনে হেনস্তার শিকার হয়ে লাইভে জ্যোতিকা জ্যোতির কান্না
দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় থেকে দূরে থাকা এবং নানা রাজনৈতিক বিতর্ক ও ট্রলিংয়ের শিকার অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এসে চরম মানসিক বিপর্যয়, পেশাগত বৈষম্য ও আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে বিতর্কিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘আলো আসবেই’ এর সঙ্গে যুক্ত অভিনেত্রী সম্পর্কে মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে লাইভের মূল একটি বার্তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সেখানে প্রধানত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া প্রতিকূল পরিস্থিতি তুলে ধরা হলেও, জ্যোতির এই মানসিক বিস্ফোরণ ও লাইভে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল নিজ রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশের দ্বারা নির্মমভাবে অনলাইন স্লাট-শেমিং ও চরিত্রহননের শিকার হওয়া।
পেশাগত বৈষম্য, মামলা ও ঘরবন্দী জীবন
লাইভে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জ্যোতি জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। বহুল আলোচিত ‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য হওয়া এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থক শিল্পী হিসেবে পরিচিত থাকায় বিগত দুই বছর ধরে তিনি কার্যত বেকার।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাকে অভিনয় জগৎ থেকে দূরে রেখেছে এবং বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের কারণে নতুন কোনো কাজ পাচ্ছেন না। অনেকে তার সঙ্গে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন বলেও তাকে জানান। এমনকি তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় নিরাপত্তার অভাবে দীর্ঘদিন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা পর্যন্ত করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে ঘরবন্দী জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
অভিনয় জীবনের এই স্থবিরতা ও আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তৈরি হওয়া তীব্র আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই বয়সে এসেও তাকে বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তাঁকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এ ছাড়া তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালে পদে পদে হেনস্তা ও অপমানিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিজ দলের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের দ্বারা নির্মম ট্রলিং
এতসব প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ সত্ত্বেও জ্যোতি বিষয়গুলোকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে জানান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিজ বলয়ের মানুষদের থেকে আসা সাইবার আক্রমণ তাঁর সহ্যের সমস্ত সীমা পার করে দেয়।
জ্যোতি অভিযোগ করেন, বিগত দুই দিন ধরে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের’ বলে পরিচিত একটি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ তাঁকে লক্ষ্য করে চরম কুরুচিপূর্ণ ও নোংরা ভাষায় আক্রমণ শুরু করে। তাঁর ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চেয়েও নিজ দলের এই শুভানুধ্যায়ীদের কুরুচিপূর্ণ আচরণ তাঁকে বেশি আঘাত করেছে।

“গত দুই বছর ধরে দেশের এই পলিটিক্যাল সিচুয়েশনে আমি যে যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, এটা কেউ জানে না।…. তো এই সবকিছু আমি মেনে নিচ্ছিলাম। কিন্তু সম্প্রতি যেই ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা আমি মেনে নিতে পারছি না গত দুই দিন ধরে। আওয়ামী লিগের একটা গ্রুপ, যাদেরকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং… তুলনামূলকভাবে ভালো বলেই জানি তারা আমাকে নিয়ে এই লেভেলের হ্যারাসমেন্ট করেছে যে, আমি এটা নিতেই পারছি না। তাদের লেখালেখি এসব কিছু পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে একটা প্রস্টিটিউট ছাড়া আর কোনো কিছু না। আমার সারা জীবনের শিক্ষা, আমার স্বপ্ন, আমার অবস্থান—সবকিছু আমার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছে।… সেই আওয়ামী লীগদের কারো কারো কাছ থেকেই শুনতে হচ্ছে যে, আমি… মানে যে তিনটি শব্দ আমাকে প্রতি মুহূর্তে হ্যামার করছে… ‘আমরা খাট কাঁপাই’, ‘আমরা বিছানা গরম করি’, মানে একটা নারীকে স্ল্যাট-শেমিং করার জন্য যতগুলো নোংরা নোংরা কথা বলতে হয়, তার কোনো কিছুই বাদ নেই। আমি এগুলো নিতে পারছি না। আমি নিতে পারছি না এবং যাদেরকে আমাদের পক্ষের লোক ভাবি, তাদের পক্ষ… তাদের থেকে এই ধরণের কথা তো আর নিতেই পারছি না। আমার সমস্ত ধৈর্যের, আমার সব ক্ষমতা শেষ।”
চূড়ান্ত অসহায়ত্ব প্রকাশ ও আকুতি
লাইভের শেষ পর্যায়ে এসে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং ‘আয়না’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘মায়া: দ্য লস্ট মাদার’ কিংবা ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ সিনেমার এই অভিনেত্রী পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি জানান, একদিকে প্রতিপক্ষের নির্যাতন, বৈষম্য ও আইনি জটিলতা, অন্যদিকে নিজ বলয়ের মানুষদের থেকে আসা এই নোংরা চরিত্রহনন—দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাঁর সমস্ত শক্তি ও ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে।
নিজের বর্তমান অবস্থাকে ‘নরকের মতো’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তিনি আর কারও কাছে গিয়ে কাজ চাইতে পারেন না, আবার কোনো প্রকার আপসও করতে পারেন না। প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন জানিয়ে তিনি বর্তমান সরকারের কাছে এই বিষাক্ত পরিস্থিতির অবসান চান। একদম শেষে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি হেল্পলেস। আমি দুঃখিত, এভাবে আমার দুর্বলতা প্রকাশ করতে হলো। কিন্তু আমার আর শক্তি নেই। আমার মনে হচ্ছে, আমি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।”

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জ্যোতিকা জ্যোতি
জ্যোতিকা জ্যোতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর (বা ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি অনুমোদিত) ঘোষিত ৯৪ সদস্যবিশিষ্ট এই উপকমিটিতে তাকে সদস্য করা হয়। এছাড়া তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়োনও চেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরেও আলোচনায় এসেছিলেন জ্যোতিকা। সে সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, তাকে অফিসকক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। পরে ফেসবুক লাইভে এসে ঘটনার নিজের বর্ণনা দেন তিনি।
সেই লাইভে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জ্যোতি বলেছিলেন, ‘চলমান পরিস্থিতির কারণে তাঁকে অফিসে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবু চাকরির দায়িত্ববোধ থেকে তিনি অফিসে যান। সেখানে গিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ দেখতে পান। পরে মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা হলে তিনি পরিস্থিতি বিবেচনায় অফিস ছাড়ার পরামর্শ দেন।
জ্যোতি জানান, নিজের কক্ষ থেকে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে বের হওয়ার সময় তিনি বাইরে থাকা লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। সে অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘যে মুখগুলো আগে পরিচিত ছিল, সেগুলো সেদিন খুব অপরিচিত লাগছিল।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী।






