Select Page

‘মায়ের অধিকার’ সিনেমার সালমান শাহ

‘মায়ের অধিকার’ সিনেমার সালমান শাহ

সালমান শাহ-র অন্যতম দুর্দান্ত অভিনয়ের ছবি ‘মায়ের অধিকার’। পরিচালক শিবলি সাদিক।

ছবির গল্পটি ছিল গভীরভাবেই সালমানকেন্দ্রিক। ছবির নামের মধ্যেই সেটা আছে। মায়ের অধিকার আদায়ে সালমানের যে যাত্রা সেখানেই ছবিটি গভীরভাবেই সালমানকেন্দ্রিক।

ছবিতে সালমান শাহর চরিত্রটি এমনভাবে দেখানো হয়েছে প্রথমবার কেউ দেখতে গেলে ভাববে কেন সালমান তার মা ববিতাকে ছেড়ে দাদী ফেরদৌসী মজুমদারের কাছে যাচ্ছে কিন্তু এর ভেতরে অন্য কারিশমা লুকিয়ে আছে। আগে থেকে বোঝা যায় না সালমান আসলে কি চায়। ববিতা বুঝতে পারে না কেন সালমান তাঁর কোল শূন্য করে চলে যাচ্ছে দাদীর কাছে যে তার মায়ের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাকে পুত্রবধূর মর্যাদা দেয়নি। মামা হুমায়ুন ফরীদিও বুঝতে পারে না কেন ভাগ্নে তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ববিতার কাছে তার আক্ষেপের বাণী ‘হিসাব মেলে না রে বইন।’ অন্যদিকে দাদী ফেরদৌসী মজুমদারও জানে না আসলে কি ঘটতে যাচ্ছে তার সাথে। ববিতার প্রতি তার সেই নিষ্ঠুর সংলাপ-“মায়ের বুক থেকে সন্তানকে কেড়ে নেয়ার যে কি জ্বালা তা আমি তোমাকে তিলে তিলে বুঝিয়ে দেবো।” কিন্তু সালমান যে কোন প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য জাহান মঞ্জিলে যাচ্ছে সেটা দাদীরও ধারণা নেই। শুধু সালমান নিজেই জানে তার পরিকল্পনা কি আর কেউ জানে না। এই যে ছবির কেন্দ্রীয় থিম সালমানের চরিত্রটিতে লুকায়িত এটাই ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা।

জাহান মঞ্জিলে আসার পর সালমানের নিজের অধিকার খাটানোতে ছিল দারুণ বুদ্ধির খেলা। দাদীর আলিশান বাড়ির দামি আসবাবপত্রগুলো ভাঙতে থাকে সালমান। ফেরদৌসী মজুমদার বলে, এত দামি জিনিসটা ভেঙে ফেললি দাদুভাই? সালমানের উত্তর-“একটা করে ভাঙব একটা করে কিনব, সবই তো আমার।” নিজের অবস্থান পাকা করার জন্য এগুলো ছিল সালমানের নিখুঁত বুদ্ধির খেলা।

“দাঁড়াও, ওখানেই দাঁড়াও। সামনের সিঁড়িগুলো বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করো না।” ববিতাকে বলা ফেরদৌসী মজুমদারের সেই সংলাপ রিপিট হয় সালমান শাহর মাধ্যমে যখন সালমান শাবনাজকে একইভাবে সংলাপগুলো বলে। মাঝখানে থাকে শুধু সময়ের ব্যবধান। সালমানের বলার ভঙ্গি, শরীরী ভঙ্গি সবকিছুর মধ্যে ফুটে ওঠে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব।

মা ববিতাকে দাদী ফেরদৌসী মজুমদার সিঁড়ি বেয়ে জাহান মঞ্জিলে ঢুকতে দেয়নি, দারোয়ানের মেয়েকে বংশের পুত্রবধূ হিসেবে মানতে পারবে না বলে। বংশ মর্যাদার অহংকারের বড়াই করেছিল, এ অহংকারের বিপরীতে সালমান একইভাবে শাবনাজকে বলেছিল মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, সালমানের কণ্ঠে ছিল মায়ের অধিকার আদায়ের সৎসাহস। সালমানের বুদ্ধিটা এখানেও দুর্দান্ত। বুদ্ধি করে শাবনাজকে বিয়ে করে আর বিয়ের রাতেই জাহান মঞ্জিলে তার সাথেও একই ঘটনা ঘটায়। তখন পর্যন্ত দাদী ফেরদৌসী মজুমদারের জিদ থাকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না ববিতাকে তখন সালমান গর্জে উঠে বলে-“আল্লাহর কসম দাদীমা, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মাকে তার অধিকার ফিরিয়ে না দেয়া হবে ততক্ষণ পর্যন্ত দিশাকে (শাবনাজ) আমি এ বাড়িতে ঢুকতে দেবো না।” শাবনাজ বিয়ের রাতেই এ বাস্তবতায় পড়বে সে তা কোনোভাবেই চিন্তা করতে পারেনি। অসুস্থ ববিতাকে হাসপাতালে দেখে সালমান শেষবারের মতো জাহান মঞ্জিলে প্রবেশ করে  ভাংচুর চালাতে থাকে।

আর ‘পিঁপড়া খাবে বড়লোকের ধন’ গানেও সালমান শাহ-র এক্সপ্রেশনগুলোর কোনো তুলনা নেই, তুলনা নেই হারমোনিয়াম ধরার স্টাইলে কিংবা গেটাপেরও।

সালমান শাহ এ ছবিতে মায়ের অধিকার আদায়ের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এত সন্তান যে নিজের বুদ্ধিমত্তায় জাহান মঞ্জিলে প্রবেশ করে এবং মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। ছবির অর্ধেক অংশ জুড়ে এটা ঘটে এবং সালমান শাহর পারফরম্যান্স ছিল মাইন্ডব্লোয়িং।


About The Author

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

Leave a reply