Select Page

টানা১০ বছর প্রদর্শনের পর ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ কি নিষিদ্ধ, নাকি বদলেছে বিমানের কনটেন্ট?

টানা১০ বছর প্রদর্শনের পর ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ কি নিষিদ্ধ, নাকি বদলেছে বিমানের কনটেন্ট?

বছরের পর বছর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে প্রদর্শিত হয়েছে তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’। হঠাৎ করে সিনেমা দুটি আর দেখা যাচ্ছে না—এমন খবর সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

কেন বাদ পড়ল সিনেমা দুটি? কোনো বিশেষ কারণে? নাকি এটি বিমানের নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তনের অংশ?

চলচ্চিত্র দুটির পরিচালক ও প্রযোজক তানভীর মোকাম্মেল নিজেও বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তার ভাষ্য, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ বিমানের ফ্লাইটে প্রদর্শন বন্ধ রাখা হয়েছে।

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ইন-ফ্লাইট বিনোদন ব্যবস্থার সিনেমা, টিভি অনুষ্ঠান ও অডিওর তালিকা নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়। লাইসেন্স চুক্তি, সার্ভারের সীমিত স্টোরেজ এবং যাত্রীদের সন্তুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাধারণত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কনটেন্ট পরিবর্তন করা হয়।

তাহলে কি ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ নিষিদ্ধ?

প্রকাশ্যে আসা তথ্য বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ বিমানের প্রদর্শন সূচি নিয়মিত পরিবর্তন হলেও বছরের পর বছর সিনেমা দুটি দেখানো হয়ে আসছিল।

তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পারে’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, মানুষের দেশত্যাগ এবং ইতিহাসের অভিঘাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন মমতাজউদ্দীন আহমেদ, আফসানা মিমি, তৌকীর আহমেদ, রওশন জামিল ও সুমিতা দেবীসহ অনেকে।

তিন বছর পর, ২০০১ সালে মুক্তি পায় ‘লালসালু’। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস, ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও গ্রামীণ সমাজের সম্পর্ক উঠে এসেছে। অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, আলী যাকের, তৌকীর আহমেদ, মেহবুবা মাহনূর চাঁদনী, আমিরুল হক চৌধুরী, চিত্রলেখা গুহ, রওশন জামিল ও মুনিরা ইউসুফ মেমীসহ অনেকে।

দুটি চলচ্চিত্রই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে একাধিক বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে তানভীর মোকাম্মেলের আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে এগুলোও প্রদর্শিত হচ্ছিল।

হঠাৎ বাদ দেওয়ার খবর

বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে চলচ্চিত্র সরবরাহের কাজ করছে ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাজী রিটন জানান, তানভীর মোকাম্মেলের বেশ কয়েকটি সিনেমা তাদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিমানের ফ্লাইটে প্রদর্শিত হয়েছে।

তবে প্রায় দুই মাস আগে তাদের জানানো হয়, ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ আর প্রদর্শন করা হবে না।

কাজী রিটনের ভাষ্য, তাদের জানানো হয়েছিল, সিনেমা দুটি দশ বছরের বেশি সময় ধরে প্রদর্শিত হয়েছে। তাই আপাতত না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে আবার প্রদর্শন করা হতে পারে।

এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—দশ বছরের বেশি সময় ধরে দেখানো হয়েছে বলেই কি সিনেমা দুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে বিমানের কনটেন্ট লাইসেন্সের মেয়াদ বা অন্য কোনো কারণ?

বিমান যা বলছে

বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখিত বক্তব্যে জানান, বিমানের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট বা অভ্যন্তরীণ বিনোদনব্যবস্থা নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়।

সাধারণত তিন মাস পরপর সিনেমা, টিভি শো ও অডিওর তালিকা পরিবর্তন করা হয়।

এর পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে। বিমান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কনটেন্টের লাইসেন্স চুক্তি, উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ সার্ভারের সীমিত স্টোরেজ এবং যাত্রীদের সন্তুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হয়।

বিমান নিজে প্রদর্শিত সিনেমাগুলোর মালিক নয়। মিডিয়া ব্রোকার ও কনটেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসব কনটেন্ট প্রদর্শনের অধিকার নেওয়া হয়।

লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হয়। আবার নতুন সিনেমা ও অনুষ্ঠান যুক্ত করার জন্যও পুরোনো কিছু কনটেন্ট সরাতে হয়।

অর্থাৎ বিমানের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সিনেমা একবার বিনোদন তালিকায় যুক্ত হলে সেটি স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হবে—এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।

তানভীর মোকাম্মেলের বক্তব্য

তবে বিষয়টিকে শুধু নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল।

তিনি জানান, বাংলাদেশ বিমান একসময় তার মোট নয়টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করত। এর মধ্যে ছিল সাতটি কাহিনীচিত্র—‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘চিত্রা নদীর পারে’, ‘লালসালু’, ‘লালন’, ‘রাবেয়া’, ‘জীবনঢুলী’ ও ‘রূপসা নদীর বাঁকে’।

এ ছাড়া ছিল দুটি প্রামাণ্যচিত্র—‘১৯৭১’ ও ‘সীমান্তরেখা’।

তানভীর মোকাম্মেলের দাবি, ২০২৪ সালের পর তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো বিমান থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালে ‘লালন’ও বাদ দেওয়া হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ ওঠার পর সেটি আবার প্রদর্শিত হয় বলে জানান তিনি।

এখন ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ বাদ পড়ায় তাঁর প্রশ্ন—কেন সিনেমা দুটি সরানো হলো?

তার ভাষ্য, এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা নেই।

‘লালন’ তাহলে এখনো কেন চলছে?

বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, তার একটি হলো—একই নির্মাতার ‘লালন’ যদি বিমানের ফ্লাইটে প্রদর্শিত হতে পারে, তাহলে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ কেন নেই?

বিমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ‘লালন’ প্রদর্শিত হচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে বিমান বলছে, সব কনটেন্টই কিনে প্রদর্শন করতে হয়। কোনো সিনেমা কখন প্রদর্শিত হবে, সেটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স ও কনটেন্ট সাইকেলের ওপর।

অর্থাৎ ‘লালন’ বর্তমানে চলছে—এ তথ্য থেকে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ বাদ দেওয়ার কারণ সম্পর্কে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি কতটা প্রাসঙ্গিক?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ সিনেমা দুটিকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে ‘নিষিদ্ধ’ বলার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসেনি।

কোনো চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞার বিষয় থাকে। এখানে বাংলাদেশ বিমান এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলেনি।

বরং তাদের বক্তব্য হলো, এটি ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্টের নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তনের অংশ।

চলচ্চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও জানিয়েছে, দীর্ঘদিন প্রদর্শনের পর আপাতত সিনেমা দুটি না দেখানোর সিদ্ধান্তের কথা তাদের জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এগুলো আবার প্রদর্শিত হতে পারে।

সুতরাং বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ‘নিষিদ্ধ’ বলার চেয়ে ‘বিমানের বর্তমান কনটেন্ট তালিকা থেকে বাদ’ বলাই বেশি তথ্যসম্মত। অবশ্যই একই সঙ্গে এ প্রশ্ন ওঠেনি যে একই কন্টেন্ট কী কারণে বছর পর বছর প্রদর্শিত হয়ে আসছিল।

বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগ দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে, ত্রৈমাসিক সাইকেল অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর নতুন কিছু সিনেমা যুক্ত হয় এবং পুরোনো সিনেমা তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এই নিয়মিত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’র সঙ্গে আরও কিছু সিনেমা বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে না।
বিমানের একটি সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলটির প্রতি অনুগত নির্মাতাদের অনেকের সিনেমা বিভিন্ন তদবিরের কারণে ওই ত্রৈমাসিক সাইকেলের নিয়ম উপেক্ষা করে দীর্ঘ দিন ধরে বিমানে প্রদর্শিত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সব সিনেমার ক্ষেত্রেই ত্রৈমাসিক পরিবর্তনের সাইকেলটি পূনরায় চালু করা হয়েছে।

ত্রৈমাসিক নিয়ম উপেক্ষা করে তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত ‘লালসালু’ চলচ্চিত্রটি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এবং ‘চিত্রা নদীর পারে’ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা বিমানে প্রদর্শিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।


তবে বর্তমানে ত্রৈমাসিক পরিবর্তনের নিয়মের অংশ হিসেবেই তানভীর মোকাম্মেলের উল্লিখিত দুটি সিনেমা প্রদর্শন তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। যদিও একই পরিচালকের ‘লালন’ চলচ্চিত্রটি বিমানের ফ্লাইটে যাত্রীদের জন্য রাখা সিনেমার তালিকায় প্রদর্শিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

সিনেমা দুটি আবার ফিরবে?

চলচ্চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, পরে আবার সিনেমা দুটি প্রদর্শিত হতে পারে।

বিমান কর্তৃপক্ষও বলছে, তাদের কনটেন্ট নিয়মিত পরিবর্তন হয়। ফলে একটি কনটেন্ট কোনো একটি সাইকেলে না থাকলেও পরবর্তী সময়ে আবার যুক্ত হতে পারে।

তাই ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ স্থায়ীভাবে বিমানের ফ্লাইট থেকে বাদ পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। বরং আপাতত বলা যায়, সিনেমা দুটি বিমানের বর্তমান ইন-ফ্লাইট বিনোদন তালিকায় নেই।


Leave a reply