Select Page

এটিএম শামসুজ্জামান এবং সতীর্থরা, গুণী অভিনেতারা পর্দার ভিলেন হলেও বাস্তবের নায়ক

এটিএম শামসুজ্জামান এবং সতীর্থরা, গুণী অভিনেতারা পর্দার ভিলেন হলেও বাস্তবের নায়ক

মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। পরনে পাঞ্জাবি-লুঙ্গি। পাক্কা লেবাসধারী। জমি বর্গা দেয়। সুদ খায়। জোর করে কৃষকের জমি-ভিটা-ঘর কেড়ে নেয়। গ্রামে তার কথাই শেষ কথা। গ্রামবাসীকে দ্বীনের পথে ডাকে। নিজের লালসার লাগাম টানতে পারে না। একটা পর একটা বিয়ে করে। গ্রামের যৌবনবতী কন্যা মণির ওপর লোভ তার। তাকে নেশায় ডুবিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তার অত্যাচারের সাম‌নে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় নয়ন। নয়নমণিকে পিষে ফেলতে উদ্যত হয় মোড়ল।

এই চরিত্রটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শক্তিশালী চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা। রূপালি পর্দায় আত্মপ্রকাশের ৫০ বছর পূরণ করেছে মোড়ল। চলতি বছর আমজাদ হোসেনের মাস্টারপিস ‘নয়নমণি’র সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। পাঁচ দশক ধরে মোড়ল বাস করছে এই দেশের দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায়। মোড়লের ভূমিকায় সার্থক অ‌ভিনয় করে সিনেমাকে যেমন একটি যুগান্তকারী চরিত্র উপহার দেন, তেমনই অভিনেতা হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এটিএম শামসুজ্জামান।

বড় পর্দার জন্য গ্রামের মোড়ল বা মাতবর চরিত্রের একটি ধাঁচ দাঁড় করান স‌খের ব‌শে ক্যামেরার সাম‌নে দাঁড়ানো এই অভিনেতা। বছরের পর বছর এই ধাঁচটিকে নিজে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, অন্য অভিনেতারাও তাকে নিঃসংকোচে অনুসরণ করেছেন। অত্যাচারী, জুলুমবাজ, স্বৈরাচার, শোষকের প্রতিনিধি হিসেবে সিনেমায় এই ধরনের চরিত্র ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে। আর প্রতিবারই পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়েছেন এটিএম শাসুজ্জামান।

‘নয়নমণি’র বিপুল সাফল্যের পর শখকে পেশায় রূপান্তর করতে হয় তাকে। কেননা ইন্ডাস্ট্রিতে তার প্রচণ্ড চাহিদা তৈরি হয়। সিনেমায় সহকারী পরিচালনার পাশাপাশি ঠেকায় পড়লে অভিনয় করেন এটিএম। অনুরোধে ঢেঁকি গিলেন। তবে টি‌ভিতে অভিনয় করেন জীবিকার তাগিদে। তৎকালীন ঢাকা টে‌লি‌ভিশ‌নে প্রচারিত হয় শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের নাট্যরূপ। সেখানে রমজান আলী চরিত্রে অভিনয় করে নির্মাতাদের চোখে লেগে থাকেন এটিএম। এরই জের ধ‌রে আমজাদ হোসেন তাকে প্রস্তাব দেন ‘নয়নমণি’র অ্যান্টাগোনিস্টের ভূ‌মিকায় অভিনয়ের। এত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দেখে পিঠটান দেন এটিএম। তাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে ছাড়েন নাছোড়বান্দা আমজাদ। তারপর সেলুলয়েডে ভিলেন চরিত্রের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের জন্ম হয়।

ঢাকাই টকিজের বয়স তখন ২০ বছর। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭৬—এই দুই দশকে মন্দ মানুষের ভূ‌মিকায় ক‌য়েকজন শিল্পী দর্শকমগ‌জে ভয় ধরা‌তে পে‌রে‌ছেন। প্রথম সবাক ছবি আব্দুল জব্বার খাঁর ‘মুখ ও মুখোশ’-এ ইনাম আহমেদ অভিনয় করেন শমসের ডাকাতের ভূমিকায়। তিনিই এই তল্লাটের চল‌চ্চি‌ত্রে প্রথম খলনায়ক।

ষাটের দশকে গোলাম মুস্তাফা, কাজী খালেক, ফতেহ লোহানী, রাজ, মেহফুজ, রাজু আহমেদ, খলিলের মতো অভিনেতাকে মন্দলোকের ভূমিকায় দেখা গেছে। তখনকার ভিলেন চরিত্রের অভিনেতারা দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলেন। দর্শনধারী হলেও গুণের বিচারে বদলোক। সুবেশী শয়তান বলা যেতে পারে। মুখে মধু অন্তরে বিষ। তাদের অনেকেই আগে নায়ক ছিলেন। নায়িকাকে বাহুডোরে নিয়ে ঘুরেছেন। পরে সেই নায়িকাকে পটাতে নিয়েছেন কত না ছলাকলার আশ্রয়!

কূটকৌশল অবধিই শেষ, তখনকার ভিলেনের চরিত্রে নৃশংসতা পাওয়া যায় না। মন্দলোক হলেও তাদের সংলাপে সুরুচির ছাপ থা‌কে। কোনো চরিত্রই চরম কদর্য রূপ ধারণ ক‌রে না। শেষ দৃশ্যে হয়তো একটা চড় খেয়ে হুশ ফে‌রে ভিলেনের। নায়ক-নায়িকার কাছে মাফ-টাফ চেয়ে শুধরে নেওয়ার শপথ কর‌লেই সি‌নেমার সমা‌প্তি।

স্বাধীনতার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। আত্মপ্রকাশ ঘটে জসী‌মের। তার নামে প্রযোজক-প্রদর্শক এক ঘাটে জল খায়। তার পর্দায় প্রবেশমুহূর্তে করতালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ। ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে বিকটদর্শন জসীম ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট পর্দায় বিভীষিকার সৃষ্টি করেন। পত্রিকায় সিনেমার বিজ্ঞাপনে তার নাম বড় হরফে ছাপা হয়। তার ছবি ছাড়া রঙিন পোস্টার ভাবাই যায় না। আর তখন থে‌কেই ভিলেনের হা‌ত র‌ক্তে র‌ঞ্জিত হয়। শেষদৃশ্যে মার খে‌লেও চিত্রনা‌ট্যে দোর্দণ্ড প্রতাপ ভি‌লে‌নের। জসীম-ওয়াসীমের তলোয়ারবাজি গোটা সত্তর দশকের বক্স অফিসকে পয়সার ঝনঝনানিতে মুখর করে রেখেছে।

জসীমের সমান্তরালে এটিএম শামসুজ্জামানের আবির্ভাব সামাজিক-পারিবারিক গল্পে দুষ্টু লোক হিসেবে। সাংসারিক ষড়যন্ত্র আর দাফতরিক চক্রান্তের মতো মন্দ কাজে নিয়োজিত থাকে এটিএম অভিনীত চরিত্রগুলো। শয়তানির সঙ্গে রসিকতা যোগ করেন এই অ‌ভি‌নেতা কাম লেখক। সূচনা হয় সিরিয়ো কমেডির। দারাশিকো, বাবর, মতিন, আদিলদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর তলোয়ারঘটিত রক্তারক্তির বিপরীতে এটিএম, মুস্তাফা, খলিলরা চোরাচালানকারী, মাদককারবারী, মজুতদার, জোতদার চ‌রিত্রগু‌লোকে পর্দায় জলজ্যান্ত ক‌রে তোলেন।

ততদিনে নায়কোচিত চেহারা-সুরত নিয়ে হাজির হয়ে গেছেন আহমেদ শরীফ। ঝাঁ‌পি মাথায় সাপুড়ে, ত‌লোয়ার ‌কোম‌রেবাঁধা উ‌জির, সরু গোঁফ মুখে মাতবর—বিচিত্র চরিত্রে তার দাপু‌টে অভিনয়। তার বিকট চিৎকারে সিনেমা হল কেঁপে ওঠে। ‘সবুজ সাথী’ আর ‘সকাল সন্ধ্যা’ ছবিতে নায়ক বনে যাওয়ার পর জসীমের হিংস্র চরিত্রগুলো চলে আসে আহমেদ শরীফের দখলে। মঞ্জুর রাহী আর মাহবুব খান গুঁইরাও ব্যস্ত সময় কাটান আশির দশকে। সব ধর‌নের সি‌নেমায় প্রবল উপ‌স্থি‌তি দেখা যায় জাঁদ‌রেল অ‌ভি‌নেতা রা‌জের। তবে একজন ভিলেন জ্বীন, দৈত্য আর রাক্ষসের রূপ ধারণ ক‌রে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। নাম না বললেও জাম্বুকে চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় কট্টর সি‌নেমা‌প্রেমী‌দের।

এই ফাঁ‌কে খলনা‌য়িকাদের কথা না বল‌লেই নয়‌। ‘জীবন থে‌কে নেয়া’র বড় আপা জ‌হির রায়হা‌নের অমর সৃ‌ষ্টি। রওশন জা‌মিল‌ এই চ‌রিত্রকে দি‌য়ে‌ছেন অমরত্ব। তার পথ ধ‌রে হেঁটে গে‌ছেন মায়া হাজা‌রিকা, রিনা খান, সুষমা, দুলারীরা। শুধু নারী চ‌রিত্রা‌ভি‌নেত্রীরা কেন, সু‌যোগ পে‌লে নায়করাও অ্যান্টিহিরোর ভূমিকায় নে‌মে প‌ড়ে‌ছেন।

ভিলেনদের এমন রমরমা বাজারে নায়ক হতে আসা রা‌জিবও নিজের সওদা পেতে বসেন। আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’ ছবিতে নিষ্ঠুর মজুতদার চরিত্রে তার অভিনয় দর্শক-সমালোচকের হাততালি পায়। নব্বই দশ‌কে কাজী হায়া‌তের ‘দাঙ্গা’ তা‌কে দেয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃ‌তি। বরাবর তার স‌ঙ্গেই উচ্চা‌রিত হয় হুমায়ূন ফরী‌দির নাম। ভি‌লে‌নের ভূ‌মিকায় তার প্রা‌প্তি ভরপুর। পারফরম্যান্সে, পা‌রিশ্রমি‌কে, প্রশংসায় তার নায়ক‌দেরও ছা‌পি‌য়ে যান ফরী‌দি।

এই তারকা পর্দায় এ‌লে কি‌শোররা হৈহৈ করে লাফায় সিটের ওপর। সমানে সিটি বাজায় তরুণরা। নব্বই দশকে ফরী‌দি, রা‌জিব, আহ‌মেদ শরীফ, ‌মিজু আ‌হ‌মেদ, সাদেক বাচ্চু, না‌সির খান, ড্যানি সিডাক, ই‌লিয়াস কোবরা, রা‌তিন, গাঙ্গুয়া, ডন, মিশা সওদাগররা মি‌লে ঢা‌লিউ‌ডে ভি‌লেন‌দের আধিপত্য কা‌য়েম ক‌রেন । নব্বই দশ‌কের শে‌ষের দি‌কে ‘সান ডে মান‌ডে কো‌লোজ কইরা দিমু’ সংলাপ ব‌লে ডিপজ‌লের আগমন ঘট‌লে ষোল কলা পূর্ণ হয়।

অবশ্য তখন থে‌কে পর্দায় ভি‌লেন‌দের আচর‌ণে বীভৎসতা আর ইতরতা দেখা যায়। কাট‌পিসের ভয়াবহতা বে‌ড়ে গে‌লে এ‌টিএম শামসুজ্জামান তার সত্তর দশকীয় ভি‌লেনসংক্রান্ত ধারণা ফি‌রি‌য়ে আ‌নেন‌। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মাতব‌রের চ‌রি‌ত্রে অসাধারণ অ‌ভিনয় ক‌রে সি‌নেমার চরম মন্দার ভেতর ‘মোল্লা বা‌ড়ির বউ‌’কে সুপার‌হিট ক‌রি‌য়ে ছা‌ড়েন। এভা‌বেই নে‌তিবাচক চ‌রি‌ত্রের অভি‌নেতা এ‌টিএম শামসুজ্জামান চল‌চ্চি‌ত্রে তার ই‌তিবাচক ভূ‌মিকা রে‌খে গে‌ছেন বারবার। তার ম‌তো গুণী অ‌ভি‌নেতারা পর্দার ভি‌লেন হ‌লেও বাস্ত‌বের নায়ক।


About The Author

মাহফুজুর রহমান

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক

Leave a reply