Select Page

২০২১: বাণিজ্য থেকে শিল্পে ভারি, আরও ডুবেছে ঢালিউড

২০২১: বাণিজ্য থেকে শিল্পে ভারি, আরও ডুবেছে ঢালিউড

বলা যায়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আরেকটি বছর দেখলো ঢাকাই চলচ্চিত্র। করোনার দোহাই দেওয়া যায় বটে! তবে ব্যবসা ও শিল্পমান বিচারে অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো গত বছরের চেয়ে খানিকটা হলেও এ বছর এগিয়ে গেছে। সে তুলনায় ঢালিউডের প্রাপ্তি প্রায় শূন্য। ব্যবসাসফল হওয়া তো দূরের কথা, মূলধন তুলতেও ব্যর্থ সিনেমাগুলো।

বছরের একমাত্র প্রাপ্তি ছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল আয়োজনে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর অফিশিয়াল মনোনয়ন, যা ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম। এছাড়া অন্যান্য বিবেচনায় বাণিজ্যিক ধারার চেয়ে শৈল্পিক ধারা এবার ছিল আলোচনায়, কিন্তু দর্শক টানেনি।

এক নজরে ২০২১

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির তথ্যমতে, ২০২১ সালে ছবি মুক্তির সংখ্যা মোট ৩০। সাফটা চুক্তিতে কলকাতা থেকে এসেছে ‘বাজি’ ও ‘গোলন্দাজ’। এছাড়া মাল্টিপ্লেক্সে বছরজুড়ে মুক্তি পেয়েছে হলিউডের ছবি।

বছরের প্রথম ছবি রবিউল ইসলাম রাজের ‘কেন সন্ত্রাসী’। বি বা সি গ্রেডের এ ধরনের কিছু মুক্তি পেয়েছে বছর জুড়ে। এ তালিকায় আছে এক সময়ের খ্যাতিমান নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘তুমি আছো তুমি নেই’, ছবিটি মার্চে মুক্তি পায়। এ ছবির জন্য সমালোচিত হন ফারদিন প্রার্থনা দীঘি। তার মন্তব্যের কারণে মামলার হুমকি দিন নির্মাতা। এ ধারায় ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় কমল সরকারের ‘রংবাজি- দ্য লাফাঙ্গা‘।

মার্চে মুক্তি পায় অরণ্য পলাশের ‘গন্তব্য’, হাবিবুর রহমানের ‘অলাতচক্র’, তৌকীর আহমেদের ‘স্ফুলিঙ্গ’ এবং শাহরিয়ার নাজিম জয়ের ‘প্রিয় কমলা’। আলোচনায় থাকলেও মুক্তির পর হতাশ করে আহমদ ছফার উপন্যাস থেকে নির্মিত ও জয়া আহসান-আহমেদ রুবেল অভিনীত ‘অলাতচক্র’, তৌকীরের তারকাবহুল ছবিটিও ছিল নড়বড়ে।

এপ্রিলে মুক্তি পায় সেলিম খানের ‘টুঙ্গিপাড়ার মিয়াভাই’, নারগিস আক্তারের ‘যৈবতী কন্যার মন’ ও এফআই মানিকের ‘সৌভাগ্য’। যথারীতি এগুলো আলোচনায় ছিল না। এর মাঝে শেষ ছবিটি সাত বছর আগে নির্মিত।

জুন ও জুলাইয়ে মুক্তি পায় অনন্য মামুন পরিচালিত দুই ছবি; যথাক্রমে শাকিব খান, মাহিয়া মাহি ও স্পর্শিয়া অভিনীত ‘নবাব এলএলবি’ এবং নিরব ও রাশেদ মামুন অপুর ‘কসাই’। দুটি ছবিই আগে মুক্তি পায় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আই থিয়েটারে। করোনার কারণে কোনো ছবিই ব্যবসার সুযোগ পায়নি। তবে ওটিটিতে প্রশংসিত হয়। এছাড়া ‘নবাব এলএলবি’র কারণে আগের বছর জেল খাটেন পরিচালক ও এক অভিনেতা।

আগস্টে মুক্তি পায় সেলিম খানের ‘আগস্ট ১৯৭৫’, সেপ্টেম্বরে বিএইচ নিশানের ‘নারী শক্তি’, অক্টোবরে আসিফ ইকবাল জুয়েলের ‘চোখ’, অক্টোবরে ‘মুজিব আমার পিতা’। ‘আগস্ট ১৯৭৫’-এর প্রশংসা করেছেন কেউ কেউ, কিন্তু বাকি কোনো ছবিই আলোচনায় স্থান পায়নি।

অক্টোবরে আসে রাশিদ পলাশের ‘পদ্মাপুরাণ’, এন রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী কথা’, প্রসূন রহমানের ‘ঢাকা ড্রিম’। এর মধ্যে গল্প বয়ানের দিক থেকে প্রশংসা পায় ‘চন্দ্রাবতী কথা’।

নভেম্বরে মুক্তি পায় এফআই মানিক পরিচালিত এক যুগে আগে নির্মিত ছবি ‘এ দেশ তোমার আমার’, আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ পারিচালিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, আবুল কাশেম মণ্ডলের ‘হৃদয়ের আঙ্গিনায়’ এবং রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের ‘নোনাজলের কাব্য’। এর মাঝে মনোযোগ কাড়ে একমাত্র ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। এ ধরনের ছবির দর্শক দেশে এখনো উল্লেখযোগ্য নয়, তা সত্ত্বেও যথেষ্ট দর্শক টেনেছে। প্রশংসা ও নিন্দা জুটেছেও প্রচুর। বলা যায়, বছরে অতিচর্চিত একমাত্র ছবি এটি।

বছর শেষে ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ সংখ্যক সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সানী সানোয়ার ও ফয়সাল আহমেদের ‘মিশন এক্সট্রিম’ ছিল বড় ধামাকা। ছবিটি ব্যবসার চেয়ে করোনায় হলবিমুখ হওয়া দর্শকদের হলে ফেরাতে চেষ্টা করেছে। কিছু প্রদর্শনী হাউসফুল হয়েছে। এ ছাড়া এসেছে নুরুল আলম আতিকের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’, সাইদুল আনাম টুটুলের ‘কালবেলা’ এবং রনী ভৌমিকের ‘মৃধা বনাম মৃধা’। ‘কালবেলা’ ছাড়া বাকি দুই ছবি চর্চিত ও প্রশংসিত। আর বছরের শেষ দিন মুক্তি পাচ্ছে মীর সাব্বিরের ‘রাত জাগা ফুল’ এবং নজরুল ইসলামের ‘চিরঞ্জীব মুজিব’। বছর শেষে এত এত ছবি মুক্তির পরও হলে ফেরেনি দর্শক, এ নিয়ে আক্ষেপ ছিল নানা মহলে।

সেরা পাঁচ ছবি: রেহানা মরিয়ম নূর, নবাব এলএলবি, চন্দ্রাবতী কথা, লাল মোরগের ঝুঁটি ও মৃধা বনাম মৃধা।

সেরা পাঁচ অভিনেতা: আজমেরী হক বাঁধন (রেহানা মরিয়ম নূর), শাকিব খান (নবাব এলএলবি), তারিক আনাম খান (মৃধা বনাম মৃধা), তাসনুভা তামান্না (নোনা জলের কাব্য) ও আরিফিন শুভ (মিশন এক্সট্রিম)।

আরও পড়ুন

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০২০

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৯

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৮

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৭

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৬

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৫

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৪

বাংলা চলচ্চিত্রের সালতামামি ২০১৩

আলোচিত ঘটনা

রেহানা মরিয়ম নূর ও বাঁধন

এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন ’রেহানা মরিয়ম নূর’। কান চলচ্চিত্র উৎসবের লাল গালিচা এবং প্রদর্শনীতে নজর কেড়েছেন পরিচালক সাদ ও অভিনেত্রী বাঁধন। বলা যায়, এই ছবির কল্যাণেই ববিতা-জয়া আহসানের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন বাঁধন। অস্ট্রেলিয়ার এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসে (অ্যাপসা) হলেন সেরা অভিনেত্রী। আমেরিকার প্রভাবশালী চলচ্চিত্রবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ভ্যারাইটি’ এ বছরের সেরা ১১ ‘ব্রেকআউট’ অভিনয়শিল্পীর তালিকায় স্থান দিয়েছে বাঁধনকে। বলিউডেও অভিনয়ের সুযোগ মিলেছে তার। এ ছাড়া একাধিক উৎসবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’।

উৎসবে আরও সাফল্য

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছাড়াও সুমিত শাহরিয়ারের ‘নোনা জলের কাব্য’ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিদেশি তহবিল পাওয়া ছবিও এটি। এ ছাড়া বুসানে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রথম ইংরেজি ভাষার সিনেমা ‘নো ল্যান্ডস ম্যান’ ও মোহাম্মদ রাব্বী মৃধার ‘পায়ের তলায় মাটি নাই’।

নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সেরা ডকুমেন্টারিভিত্তিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইডফার মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে কামার আহমাদ সাইমনের ‘অন্যদিন’। এছাড়া ‘কান ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২১’-এ আগস্ট মাসে সেরা অ্যানিমেশন ফিল্ম হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে ‘টুমরো’ এবং সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিযোগিতায় ‘বেস্ট ফিলোসফিক্যাল ফিল্ম’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে ‘একজন ঈশ্বরের গল্প’।

শাকিব খানের ‘দেশত্যাগ’

এ বছর প্রেক্ষাগৃহে শাকিবের একমাত্র ছবি ছিল আগের বছর ওটিটিতে আসা ‘নবাব এলএলবি’। এ ছাড়া টানা কাজ করেছেন ‘অন্তরাত্মা’ ও ‘গলুই’ ছবিতে। দ্বিতীয়টি ছিল সরকারি অনুদানে শীর্ষ নায়কের প্রথম ছবি। তবে বছরের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড নিয়ে আলোচনায় আছেন তিনি। অক্টোবরে একটি অ্যাওয়ার্ড ফ্যাংশানে যোগ দিতে গিয়ে দেশে ফেরেননি তিনি। সেখানেই নতুন ছবির কাজ করছেন। শোনা যাচ্ছে, গ্রিনকার্ড কনফার্ম করে দেশে ফিরবেন ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে। এ ছাড়া এফআই মানিকের ‘স্টোরি অব শাকিব খান’ নামের সিনেমার নির্মাণের ঘোষণার পর মামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

আইনি ঝামেলা ও একাধিক ছবিতে পরী মনি

আইনি ঝামেলায় পড়ে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন বাণিজ্যিক ছবির অন্যতম প্রধান নায়িকা পরীমনি। জুনে তাকে ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে নাসির উদ্দিন মাহমুদ নামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করা হয়। এরপর ৪ আগস্ট বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন পরীমনি, তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেয় র‍্যাব। বারবার রিমান্ড নিয়ে একসময় নাখোশ হয় আদালত। গ্রেপ্তারের ২৬ দিনের মাথায় ৩১ আগস্ট জামিন পান অভিনেত্রী। জামিনে মুক্তির পাওয়ার পর বেশকিছু প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছেন।

মাহির বিয়ে ও কল রেকর্ড ফাঁস

পারভেজ মাহমুদ অপুর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান সরকার রাকিবকে বিয়ে করেন মাহিয়া মাহি। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান ও মাহি এবং নায়ক ইমনের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। সেখানে মাহিকে অশ্নীল কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। এরই জেরে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে হয়।

বাড়ছে মাল্টিপ্লেক্স

২০১৮ সাল থেকেই প্রতি সপ্তাহে মুক্তি দেওয়ার মতো ছবি তৈরি হচ্ছিল না। একের পর এক হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন তা ১২শ’ থেকে অর্ধশতকে নেমে এসেছে। প্রথাগত প্রযোজনা, পরিবেশনা, প্রচার, প্রদর্শন ব্যবস্থাই বিকল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বেশ কিছু নতুন মাল্টিপ্লেক্সের ঘোষণা দিয়েছে স্টার সিনেপ্লেক্স। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী, বগুড়া ও চট্টগ্রামের আউটলেট। তাদের প্রধান জোগান হলিউডের সিনেমা। তবে ভারতীয় সিনেমাও চাইছেন বরাবরের মতো।


মন্তব্য করুন