Select Page

ঈদুল ফিতরে ছিল ভারতীয় পুঁজির দাপট, কোরবানির সিনেমায় প্রায় ‘শূন্য’

ঈদুল ফিতরে ছিল ভারতীয় পুঁজির দাপট, কোরবানির সিনেমায় প্রায় ‘শূন্য’

গত ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোয় বিদেশী পুঁজি ও কলাকুশলীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ভারতীয় বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে এবারের ঈদুল আজহায়। কোরবানির ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোয় বিদেশী পুঁজির উপস্থিতি ছিল প্রায় ‘শূন্য’।

ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছিল ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘দম’, ‘রাক্ষস’, ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ ও ‘প্রেশার কুকার’। এর মধ্যে বেশির ভাগ সিনেমার সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে বিদেশী পুঁজি যুক্ত ছিল। পাশাপাশি নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়েও বিদেশী, বিশেষ করে ভারতীয় কলাকুশলীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে সফল সিনেমা ছিল তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। মাল্টি-স্টারার সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে বুড়িগঙ্গা টকিজ ও ডোপ প্রডাকশন। সহপ্রযোজক হিসেবে ছিল হইচই স্টুডিও, যা মূলত পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক এসভিএফ (শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস) -এর বাংলাদেশকেন্দ্রিক নতুন ভেঞ্চার। সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে।

আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’। সিনেমাটি প্রযোজনা করে আলফা আই-এসভিএফ লিমিটেড, আর সহপ্রযোজনায় ছিল স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম চরকি। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এসভিএফ এর আগে বাংলাদেশের একাধিক যৌথ প্রযোজনার সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, ব্যবসায়িক সুবিধার কথা বিবেচনা করে তারা আলফা আইয়ের সঙ্গে নতুন প্লাটফর্ম আলফা আই-এসভিএফ গঠন করে। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি চরকির সঙ্গে যৌথভাবে সিনেমা প্রযোজনা করেছিল।

ঈদুল ফিতরের বক্স অফিস বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সর্বোচ্চ আয় করা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘দম’ দুটি ভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নামে হলেও এসভিএফের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এরই মধ্যে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এসভিএফের স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম হইচই-এ মুক্তি পেয়েছে।

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘দম’-এর পর ব্যবসায়িকভাবে সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা ছিল ‘রাক্ষস’। সিনেমাটির প্রধান লগ্নিকারক আজিম হারুন, যিনি শ্রীলঙ্কার নাগরিক এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে তার একাধিক ব্যবসা রয়েছে। ‘রাক্ষস’-এর শুটিংও হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। সিনেমাটির সঙ্গে ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার কথাও শোনা যায়। এছাড়া প্রধান অভিনেতা সিয়াম আহমেদ ছাড়া ছবিটির অধিকাংশ কলাকুশলী ছিলেন ভারতীয়। এমনকি সিনেমার প্রযুক্তিগত ও কারিগরি কাজের বড় একটি অংশও সম্পন্ন হয়েছে ভারতে।

অন্যদিকে আবু হায়াত মাহমুদ পরিচালিত ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ নিয়েও ছিল ভারতীয় সংশ্লিষ্টতা। জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যায়নের কারণে কাগজপত্রে সিনেমাটি যৌথ প্রযোজনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে নির্মাণের সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নানা জটিলতার মুখে পড়ে ছবিটির টিম। কলাকুশলী ও টেকনিক্যাল টিমের বড় অংশ ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগতে হয় তাদের, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়ায়। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

সম্প্রতি ‘প্রিন্স’-এর প্রযোজক পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি-সংশ্লিষ্ট টালিউড নেতাদের কাছেও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়, শুটিংয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা (ইনসেনটিভ) দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই সুবিধা পাওয়া যায়নি। বরং কলকাতায় কাজ করতে গিয়ে প্রত্যাশার তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ব্যয় বহন করতে হয়েছে।

অন্যদিকে, বিদেশী বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণে সরব ঈদুল ফিতরের পর এবারের ঈদুল আজহার চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। কোরবানির ঈদে মুক্তি পেয়েছে ‘রকস্টার’, ‘বনলতা সেন’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘মাসুদ রানা’ ও ‘পিনিক’। যতদূর জানা যায়, এসব সিনেমার কয়েকটির পোস্ট-প্রডাকশনের কাজ ভারতে সম্পন্ন হলেও প্রযোজনা বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশী অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত, প্রায় শূন্যের কোঠায়।

ফলে দুই ঈদের সিনেমা বাজারের তুলনামূলক চিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে ঈদুল ফিতরে ভারতীয় পুঁজি, প্রতিষ্ঠান ও কলাকুশলীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল, সেখানে ঈদুল আজহার চলচ্চিত্র বাজার ছিল মূলত দেশীয় প্রযোজক ও বিনিয়োগকারীনির্ভর।

বাংলাদেশের সিনেমা বাজার নিয়ে ভারতীয়দের আগ্রহ বেশ পুরোনো। সাম্প্রতিক দশকগুলো এসভিএফ ও এসকে ফিল্মস একাধিক দফায় যৌথ প্রযোজনায় বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে। কিন্তু যৌথ প্রযোজনার জটিল সমীকরণের কারণে তাদের পিছিয়ে যেতে হয়। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা প্রতিষ্টান খোলাকে তারা লাভজনক মনে করছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে আউটলেট খুলে সিরিজ নির্মাণ করতে গিয়ে বছর দু-এক আগে বিপত্তিতে পড়ে ঢাকার চরকি। বাধ্য হয়ে তাদের সরে আসতে হয়।


Leave a reply