Select Page

‘হাওয়া’ সিনেমার শক্তিশালী ও দুর্বল দিক

‘হাওয়া’ সিনেমার শক্তিশালী ও দুর্বল দিক

নাম ‘হাওয়া’ কেন রাখা হয়েছে সেটা পুরো সিনেমা দেখেও বুঝতে পারলাম না

স্পয়লার অ্যালার্ট: আলোচনার প্রয়োজনে লেখক রিভিউতে কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরেছেন। ছবিটি দেখা না থাকলে আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন

‘বেদুইন’ থেকে ‘বেদে’র উৎপত্তি। সপ্তম শতকে যাযাবর আরব বেদুইনদের একটা অংশ ভারতবর্ষে এসেছে। তারও প্রায় দেড় শতাব্দী আগে আরব বিশ্বে ইসলাম ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছিল। তাই কিছুটা স্বাতন্ত্র্য ধর্মীয় সংস্কৃতি থাকা সত্বেও বেদেরা মুলত ইসলাম ধর্মেরই অনুসারী। বেদেরা সাপুড়ে। হিন্দু মিথলজির দেবী মনসার সঙ্গে সাপের একটা সম্পর্ক আছে। তাই এ সম্প্রদায়ের একটা অংশ মনসা দেবীকে ভক্তি করলেও পূজা-অর্চা তারা করে না। এবং তাদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেব-দেবীর সেই অর্থে কোনো সম্পর্ক নাই, যেহেতু ইসলাম একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম।

কিন্তু তবুও ‘হাওয়া’ সিনেমায় বেদে মেয়ে গুলতি কোনো এক অজ্ঞাত দেবীর আর্শিবাদপুষ্ট হয়ে চাঁন মাঝির বোটে ওঠা নিয়ে কিঞ্চিৎ সমালোচনার জায়গা থাকলেও কিছু ‘যদি’ ‘কিন্তু’র কারণে সেটা সমালোচনা থেকে বাদ দেয়া যায়।

চাঁন মাঝির নেতৃত্বে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে একটি ফিশারি ট্রলার নিয়ে একদল মৎস্যজীবীর গভীর সমুদ্রে যাত্রার মাধ্যমে হাওয়া সিনেমার গল্পেরও যাত্রা। একটি গল্পের সাধারণত দুটি অংশ; প্রথম অংশে কাহিনির পটভূমি তৈরি হয়, শেষাংশে গল্প এগোতে থাকে পরিণতির দিকে। ‘হাওয়া’র প্রথম অংশ কিছুটা ধীরগতি ছিল। ফলে শেষাংটায় একটু বেশি তাড়াহুড়ো চোখে লেগেছে। তবে গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো অসামঞ্জস্য ছিল না। চমৎকার ধারাবাহিকতা ছিল। কাহিনির বুনন ছিল এককথায় অনবদ্য। ‘হাওয়া’ পরিচালক মেজাবউর রহমান সুমনের প্রথম সিনেমা। নির্মাণশৈলী দেখে বোঝা যায় দুর্দান্ত এক শিল্পসত্তা আছে মানুষটার মননে। প্রথম সিনেমায় নিখুঁত চিত্রনাট্য সেটা প্রমাণ করে।

মুক্তির পর থেকে ‘হাওয়া’র সিনেমাটোগ্রাফি খুব প্রশংসা কুড়িয়েছে। মানতেই হচ্ছে এই প্রশংসা অমূলক ছিল না। এর আগে বাংলাদেশি আর কোনো সিনেমায় এত দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি দেখা যায়নি। ‘হাওয়া’র সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে সিনেমাটোগ্রাফি আর দুর্বল দিক হচ্ছে কাহিনি। মিথলজিক্যাল গল্প। মিথকে যুক্তির বাটখারায় তুলোধুনো করা প্রগলভতা। তাই গল্পের কাহিনি নিয়ে খুব বেশি সমালোচনা সুযোগ নেই। কিন্তু গল্পের ভিত খুব শক্তিশালী মনে হয়নি। মনে হচ্ছে এখানটায় আরো কাজ করার সুযোগ ছিল। যেমন, শেষ দৃশ্যে চরিত্রগুলোকে এলোপাতাড়ি খুন করা হয়েছে। মনে হচ্ছিল দ্রুত গল্প শেষ করার তাড়া ছিল। তাই যথেষ্ট কারণ তৈরি না করেই একটা চরিত্রের হাতে খুন করেছে আরেকটা চরিত্রকে। চাঁন মাঝির একটা কুখ্যাত অতীত আছে। এককালের ডাকাত সর্দার চাঁন মাঝি গুলতির বাবাকে হত্যা করে। যার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে কাহিনির ভিত। সেটাকে কোনোভাবে চিত্রনাট্যে ধারণ করা গেলে গল্পের প্রাসঙ্গিকতা আরো জোরালো হতো।

‘হাওয়া’র প্রধান চরিত্র কোনটি? চাঁন মাঝি নাকি গুলতি? উত্তরটা খানিকটা দ্বান্দ্বিক। সে যাইহোক, মাছ ধরার ট্রলারের প্রধান মাঝির চরিত্রটি চঞ্চল চৌধুরী চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। গুলতি চরিত্রে রহস্যকন্যা হিসেবে নাজিফা তুষি ছিল অনবদ্য। নাসির উদ্দীন খান যতক্ষণ পর্দায় থাকে ততোক্ষণ সবটুকু আলোই সে একাই কেড়ে নেয়। এই লোকটি অনেকদূর যাবে। ইব্রাহিম চরিত্রে শরিফুল রাজ, এজা চরিত্রে সুমন আনোয়ার, উরকেস চরিত্রে সোহেল মণ্ডল, পারকেস চরিত্রের রিজু, মরা চরিত্রে মাহমুদ আলম, ফনি নামে বাবলু বোসের অভিনয় প্রশংসনীয় হয়েছে। 

যে ক’জন অভিনয় শিল্পীর কারণে বাংলাদেশের চিত্রজগতকে এখনো পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারিনি চঞ্চল চৌধুরী তারমধ্যে অন্যতম। ছোটপর্দার কথা বলাইবাহুল্য, চঞ্চল চৌধুরী এ যাবত যতগুলো সিনেমায় অভিনয় করেছে, প্রত্যেকটিতে আগেরটাকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু ‘হাওয়া’য় চঞ্চল চৌধুরী কোথাও যেন খোঁড়াচ্ছিল। একজন অভিনয়শিল্পীর অভিনয়কে পর্দায় যখন অভিনয়ই মনে হয়, তখন সেটাকে খারাপ অভিনয় ধরা হয়। এ জায়গায় চঞ্চল বরাবরই ব্যতিক্রম ছিল। তার অভিনয় দেখে বোঝার উপায় থাকে না এটা অভিনয় নাকি বাস্তবতা। কিন্তু ‘হওয়া’য় কোথাও কোথাও চঞ্চলকে দেখে সত্যি মনে হচ্ছিল অভিনয় করছে। মনে হচ্ছিল চরিত্রের খুব গভীরে ঢুকতে পারেনি।

সিনেমার নাম ‘হাওয়া’ কেন রাখা হয়েছে সেটা পুরো সিনেমা দেখেও বুঝতে পারলাম না। হয়তো পরিচালকের কাছে এটার যৌক্তিক কোনো উত্তর থাকবে। তবে যতই ব্যাখ্যা থাকুক, সিনেমা দেখেও দর্শক যদি এর নামকরণের উদ্দেশ্যে বুঝতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে গল্পের নামকরণ সার্থক হয়নি। কাহিনি ও আবহের সঙ্গে শিরোনাম সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি। তাই বলা যায় ‘হাওয়া’ সিনেমার নামকরণ সার্থক হয়নি।

তিমির রাত্রিতে জনমানবহীন গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত ট্রলারের ওপর বর্ষার অবিরাম বারিধারা। আকাশ ভাঙা সেই বৃষ্টিতে একদল মাঝিমাল্লার সমুদ্রযাপন, দূর সমুদ্রে মাছধরা ট্রলারে মৎস্যজীবী মানুষের জীবনের রোমাঞ্চ, আনন্দ কিংবা হাহুতাশ, সূর্যরশ্মির সাথে সমুদ্রের নীল জলের ওঠানামার তরঙ্গ, জোছনা রাতে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠা ফেনীল সমুদ্রের কাব্যিক রূপ, জলের ভেতর তিমির অবগাহন; সবকিছু যেন দক্ষ কোনো চিত্রকার তার নিপুণ হাতে চিত্রায়িত করেছে ‘হাওয়া’র গল্পে। ছোটখাটো কিছু বিচ্যুতি বাদ দিলে একবাক্যে চমৎকার একটি চলচ্চিত্র।

রেটিং: ৭/১০


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

রহমান বর্ণিল

"বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী"

মন্তব্য করুন