Select Page

অন্তরে অন্তরে পিরিতি বাসা বান্ধেরে

অন্তরে অন্তরে পিরিতি বাসা বান্ধেরে

অন্তরে অন্তরে; পরিচালক – শিবলি সাদিক; শ্রেষ্ঠাংশে – সালমান শাহ, মৌসুমী, শশী, আনোয়ারা, রাজিব, শারমিন, নাসির খান প্রমুখ; উল্লেখযোগ্য গান – কাল তো ছিলাম ভালো, ভালোবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া, এখানে দুজনে নিরজনে, অন্তরে অন্তরে পিরিতি বাসা বান্ধেরে; মুক্তি – ১০ জুন ১৯৯৪

‘না না, দর্শক স্যাটিসফাইড না
অন্তরে অন্তরে দেখে দর্শক স্যাটিসফাইড হতে পারছে না।কারণ ‘অন্তরে অন্তরে’ একবার না বারবার দেখার মতো ছবি।’
‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমার অফিসিয়াল পোস্টারের এ কথাগুলো পড়তে পড়তে দর্শক বুঝে যাবেন আমাদের চলচ্চিত্রের প্রচারণা আগে কত ন্যাচারাল আর শক্তিশালী ছিল।

‘অন্তরে অন্তরে’-র টাইটেল সং দিয়েই ছবিটিকে বিশ্লেষণ করা যায়। ‘অন্তরে অন্তরে পিরিতি বাসা বান্ধে রে’ গানের মর্ম মনের মধ্যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে এবং তা প্রকাশিত হবেই প্রিয়জনের জন্য। সে ভালোবাসার অনেক রং। কাউকে মন থেকে চাওয়া, কারো জন্য অপেক্ষা করা, দূরত্ব থাকলে টান অনুভব করা, রাগ থাকলে অনুরাগ পুষে রাখা, অপরাধ থাকলে ক্ষমা করা এমন অনেককিছু। এ সিনেমা সেইসব মানবিক অনুভূতি দিয়েই গড়া।

শিবলি সাদিক শুধুই পিওর রোমান্টিক ড্রামা নির্মাণ করেছেন সেটা যদি কেউ ভেবে থাকে তবে বিরাট ভুল করবে। রোমান্টিকের অাবরণ অনেক বেশি আছে ছবিটিতে সেটা সত্য কিন্তু ‘অন্তরে অন্তরে’ নামটি শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে সৃষ্ট না, বন্ধনটি দাদী-নাতির, শাসক-শোষিতের, মালিক-অপরাধীর।

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে থেকে ‘অন্তরে অন্তরে’ শুরু হয়েছে রাজতন্ত্রের আবহে। শওকত আকবর ছিল সে রাজ পরিবারের শাসনকর্তা। ভালোবেসে বিয়ে করে তার ছেলে ঘরে বৌ আনাতে মেনে নেয়নি। প্রেমের বিয়ের সাথে রাজ পরিবারের ইগো সমস্যা থাকে এবং সেটা পুরনো কালচার। ছেলের জায়গা হয়নি। বিদেশ থেকে সেই ছেলের সন্তান হয়ে আসে নাতি সালমান শাহ। অনেকদিন বাদে তাকে দাদী আনোয়ারা বুকে টেনে নিলেও স্বামীর কাছে দেয়া কথার জন্য ফিরিয়ে দেয়। নাতি তো নাছোড়বান্দা তাই ফিরিয়ে দিলেও রাজবাড়ির সামনেই গাট্টি বেঁধে থাকে। দাদী-নাতনী দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, টান এসব গল্পে জায়গা করে নেয় ধীরে ধীরে।
দাদীর সাথে নাতির সম্পর্ক বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। অানোয়ারা সালমানকে যতই দূরে সরিয়ে রাখুক সালমান ছাড়ার পাত্র না। তাই রাজবাড়ির সামনে আসন পাতে। গান ধরে-‘ও দাদাী, ও দাদী আমি তোমার দিবানা।’ অসাধারণ গান। সালমানকে মারধর করলে আনোয়ারা বলে-‘ওর গায়ে হাত তুলতে কে বলেছে?’ জ্বরে পড়লে বৃষ্টির মধ্যে থেকে সালমানকে প্রাসাদের ভিতর নিয়ে যায় মৌসুমীর কথায়। মৌসুমী রক্তের সম্পর্কের অধিকারটা স্মরণ করিয়ে দেয় আনোয়ারাকে। রক্তের বন্ধনটাই দাদী-নাতি সম্পর্কে আনোয়ারা-সালমান অংশে অন্তরে অন্তরে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।

রোমান্টিক যাত্রাটা সালমান-মৌসুমী দিয়ে ছবিতে অনবদ্য সময় কাটানোর কিছু সুযোগ আনে। এ জুটির চারটি ছবির মধ্যে এটা অন্যতম প্রধান। এ জুটির সুপারহিট তকমার দ্বিতীয় ফসল এটি। এ জুটির খুনসুটিগুলো যে কারো মন ছুঁয়ে দেবে। সালমান বিপদে পড়লে মৌসুমী সে সুযোগ নেয়। দেখাই হয় এমনভাবে যখন সালমান ক্যামেরায় ছবি তুলছিল। মৌসুমী ধরা পড়ে ক্যামেরায়। দুজনে বাগবিতণ্ডায় জড়ায়। একবার মৌসুমীকে বিপদে ফেলে সালমান কারণ তার কাছে ঐ ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো ছিল। মৌসুমী ছবিগুলো চাইলে ক্ষমা চাইতে বলে সালমান। একবার বাংলায় আর একবার ইংরেজিতে কিন্তু মৌসুমী ইংরেজি না জানাতে বিপদে ফেলে সালমান। ‘আই লাভ ইউ’ মানে ‘আমাকে ক্ষমা করো’ এটা বলতে বলে। পরে আনোয়ারার কাছে গিয়ে জানতে পারে আসল অর্থ। সালমানকে খাবারের সাথে বেশি ঝাল দিয়ে মুখ জ্বালিয়ে দেয়। এভাবে খুনসুটিতে তাদের রসায়ন জমে ওঠে। তাদের ভালোবাসা ‘এখানে দুজনে নিরজনে’ গানে প্রকাশ পায়।

জেলেদের সাথে মালিক আনোয়ারার সম্পর্ক, নাসির খানের ভেতরে ভেতরে গড়া চক্রান্ত এবং সালমান-মৌসুমীর প্রেমের পরিণতিতে ছবি ফিনিশিং পর্যন্ত এগিয়ে যায়।

গান ছিল এ ছবির প্রাণ। রোমান্টিক, পারিবারিক, আধ্যাত্মিক গানের অপূর্ব সমাহার অাছে। হাইপ তোলা গান সবগুলো। ‘কাল তো ছিলাম ভালো/ আজ আমার কী হলো/ সে কথা কইতে পারি না’ এ গান রেডিওর ‘অনুরোধের অাসর গানের ডালি’-তে একটা সময় রোজ শোনার অনুরোধ আসত। প্রবাল দ্বীপে চিত্রায়িত অসাধারণ রোমান্টিক গান। মৌসুমীকে বাঙালি নারীর সৌন্দর্যে গানটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘এখানে দুজনে নিরজনে’ বহুল জনপ্রিয় গান। প্রবাল দ্বীপে একজোড়া প্রেমিক-প্রমিকা আর সহশিল্পীদের মন মাতানো পারফরম্যান্সের গান ‘ভালোবাসিয়া গেলাম ফাঁসিয়া’। কলাগাছের বাগান আর ঝিকিমিকি আসর সাজানো কালচারাল টাচ আছে গানে। সালমান-মৌসুমীকে বুড়ো-বুড়ি সাজতে দেখা যায়। পাল্টাপাল্টি যুক্তি থাকে গানে কেউ কারো থেকে কম না। মৌসুমীকে কথায় হারাতে চাইলে মৌসুমী জবাব দেয়-‘আমিও কম না হীরা কি পান্না/দেখো না যাচাই করিয়া।’ এরপর সালমানকে হারাতে চাইলে সালমান বলে-‘আদরী ময়না ধরিলে বায়না/নেবো না ঘরে তুলিয়া।’ গানটি এই অসাধারণ খুনসুটিতে এনজয়অ্যাবল। রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোরের মন মাতানো কণ্ঠে আরো জাদু আসে। আধ্যাত্মিক কথা ও সুরে ‘অন্তরে অন্তরে পিরিতি বাসা বান্ধে রে’ আর একটা মাস্টওয়াচ সং খালিদ হাসান মিলুর গলায়। ‘প্রেম’-কে ‘পিরিতি’ শব্দ দিয়ে আঞ্চলিকতার স্বাদ দেয়া হয়েছে যেখানে মাটির পরশ মিলবে।

ফ্যাশন আইকন সালমান শাহ-র ফ্যাশন দেখতে হলে ‘অন্তরে অন্তরে’ মাস্ট ওয়াচ ফিল্ম। মৌসুমী পাহাড় থেকে পড়ে যাবার সময় হাত টেনে ধরলে মাথার কাপড়টি দৃষ্টি কাড়বেই। ‘ও দাদী ও দাদী’ গানে ক্যাপটা লক্ষ করার মতো। ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় কস্টিউম খেয়াল করলে আপগ্রেড সালমানকে চেনা যায়। আমরা যে সেলফি ম্যানিয়ায় ভুগি সেটা সালমান এ ছবিতে করে গাছে ক্যামেরা ঝুলিয়ে।

‘অন্তরে অন্তরে’ শব্দটা দুইবার ব্যবহৃত হয়েছে। দু’বার শব্দটা বলে দেয় বন্ধন বা সম্পর্ক একজনে হয় না। মানুষে মানুষে বন্ধন হয় তাই শব্দ হয়েছে দুটি ‘অন্তরে অন্তরে।’ সে বন্ধন ভালোবাসা হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা, শাসক-শোষিত, দাদী-নাতি এমন সব সম্পর্ক থেকে মানবিক হয়ে উঠেছে অভিনয়সমৃদ্ধ এ সিনেমাতে। যত রাগ, অভিমান থাক ভালোবাসা থাকে গোপনে। ‘পিরিতি’ বাসা বুনে নেয় তার মতো করে।


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র গত শতকে যেভাবে সমৃদ্ধ ছিল সেই সমৃদ্ধির দিকে আবারও যেতে প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি। সেকালের সিনেমা থেকে গ্রহণ বর্জন করে আগামী দিনের চলচ্চিত্রের প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠুক। আমি প্রথমত একজন চলচ্চিত্র দর্শক তারপর সমালোচক হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি। দেশের সিনেমার সোনালি দিনের উৎকর্ষ জানাতে গবেষণামূলক কাজ করে আগামী প্রজন্মকে দেশের সিনেমাপ্রেমী করার সাধনা করে যেতে চাই।

মন্তব্য করুন