Select Page

চমকে ঠাসা ‘১৯৭১ সেই সব দিন’, সিনেমার নতুন ভাষার শ্রেষ্ঠ প্রয়োগ

চমকে ঠাসা ‘১৯৭১ সেই সব দিন’, সিনেমার নতুন ভাষার শ্রেষ্ঠ প্রয়োগ

এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা যেন ‘১৯৭১ সেই সব দিন’ …

একটা সিনেমার ফ্রেমে ফ্রেমে তারার (তারকা) ঝলক, একটা সিনেমার দেখে বিরক্ত হবার সুযোগ শূন্য ভাগ, একটা সিনেমায় ৫২ বছর আগের বিখ্যাত এবং দুর্লভ স্থির ও ভিডিওচিত্রের নতুন করে সফল চিত্রায়ন, একটা সিনেমার আর্ট, কস্টিউম, ফ্রেম, কাহিনি, গল্পের সফল জাম্প, কাল্পনিক ফিকশনের চেয়ে বাস্তবতার সর্বোচ্চ কাছাকাছি থাকার চেষ্টায় সফল হওয়া, ক্যামেরাওয়ার্ক, সম্পাদনা, শুরু থেকে শেষ এক রিদমে এগিয়ে যাওয়া, আবেগ, প্রেম, দ্বিধা এমন সবগুলো বিভাগে যদি শতভাগ উৎরে যায় তখন আসলে সমালোচনা/রিভিউ লেখা খুব কঠিন হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সিনেমার গল্পে কোন বিচ্যুতি না রেখে এর আগে এভাবে সফল জাম্প দিয়ে কেউ গল্প বলতে পেরেছে কিনা জানা নেই। আসলে ড. এনামুল হকের মতো সভ্য-শিক্ষিত মানুষের ভাবনা যখন কোন গল্পে পড়ে, তখন সে গল্প আকাশ ছোঁয়ার সম্ভাবনা রাখবেই। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায়, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সিনেমাটিক ভাষা এবং ভাবনা থেকে বেরিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা যেন ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশী সিনেমায় সিনেমাটিক নতুন ভাষার শ্রেষ্ঠ প্রয়োগ হয়ে গেল।

মুক্তিযুদ্ধকালীন পৃথিবীর বিখ্যাত আলোকচিত্রী এবং ডকুমেন্টারী নির্মাতাদের ছবি এবং ভিডিওর মুহূর্তগুলো এক-দেড় সেকেন্ডের দৃশ্যায়নে নির্মাতা হৃদি হক যেভাবে তুলে ধরেছেন তা ছিল অনেক বড় চমক। দৃশ্যায়নে এতটুকু চিড় ধরতে না দিয়ে সেই দৃশ্যগুলোকে নতুনভাবে শুটিংয়ে তুলে ধরাটা অনেক বড় সফলতা। অন্যদিকে সিনেমাটিতে লিটু আনামের আর্ট ডিরেকশন বাংলা সিনেমার নবীন আর্ট ডিরেক্টরদের জন্য ছোটখাটো একটা কোর্সের মতো শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।

নো কাট শট থেকে শুরু করে প্রতিটা দৃশ্যের ক্যামেরার কাজ দুর্দান্ত এবং দুর্দান্ত। স্মার্ট একটি গল্পকে কীভাবে স্মার্টলি স্ক্রিনে দেখাতে হয় তারও এক অনন্য উদাহরণ সিনেমাটি। সিনেমার লোকেশন এই সিনেমার প্রাণভোমরা। এ যেন ২০২৩ এর ঢাকা নয়, বরং ১৯৭১ এর ঢাকাই যেন। কীভাবে এই লোকেশন আবিস্কৃত হয়েছে জানি না। এর চেয়ে ভালো লোকেশন হওয়া কোনোভাবেই হয়ত সম্ভব না। সিনেমাটি একটা সময় পরপর কাহিনির যে চমক এবং টুইস্ট দেখিয়েছে তা দর্শককে খুব ভালোভাবে তৃপ্তি দেবে। কী দিন, কী রাতের দৃশ্য, আলোর কী অসাধারণ ব্যবহার পুরো সিনেমার জুড়ে। আরে মেকআপ-গেটআপের কথা কী বলবো! জাস্ট ওয়াও।

সিনেমাটির আর্টিস্ট প্যানেল বেশ শক্তিশালী। ফ্রেমে ফ্রেমে এত এত তারকা এবং সুঅভিনয় শিল্পীদের একত্রিত করতে পারাটা ভাগ্যের ব্যপার। বহু বছর পর সেই ফেরদৌসের দেখা পাওয়া, লিটু আনামের সেই ধার, সজলের সেই চার্ম, সাজু খাদেমের নির্লিপ্ত ধারালো চাহনি, হৃদি হকের গ্ল্যামার, অভিনয় ও গর্ভবতী মায়ের সময়কার শারিরিক পরিবর্তন দেখানো এবং সানজিদা প্রীতির ‘ওহ মাই ডার্লিং’ ইমেজ মনে থাকবে বহুদিন। এছাড়া ছোট ছোট চরিত্রে মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মুনমুন আহমেদ, আনিসুর রহমান মিলন, নাজিয়া হক অর্ষা, জুয়েল জহুর, মৌসুমী হামিদ আর এক গানের ঝলক সোনিয়া হোসাইন প্রমুখ সিনেমাটিকে খুব ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

সিনেমাটি অর্থনৈতিক সফলতা হয়তো পাবে না। কারণ সেখানে দর্শকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু একটি সফল এবং সার্থক সিনেমা হিসেবে ইতিহাসে থাকবে ‘১৯৭১ সেই সব দিন’। সিনেমাটি সত্যিই দেখার মতো সিনেমা। সিনেমাটি, সিনেমা দেখে তৃপ্তি পাবার মতো সিনেমা। ড্রামাটিক-যুদ্ধ জনরার সিনেমার হিসেবে সিনেমাটি অনবদ্য।

সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জোরালো দাবীদার হয়ে গেল। শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ ক্যামেরাম্যান, শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক, শ্রেষ্ঠ খল চরিত্রে, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্র বিভাগগুলোতে লবিং পার্টিকে ভোগাবে। অন্যদিকে অনেকগুলো চরিত্রে পুরো সিনেমার জুড়ে বিচরণ করায় শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও অভিনেত্রী এককভাবে স্ক্রিন টাইম কাভারের কোপে না পড়লে সেই বিভাগ দুটোতেও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখবে। 

ব্যাক্তিগতভাবে আমি কখনই কোন সিনেমার রেটিং দেই না। রেটিং করার জন্য অনেক বিষয়ে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়। তাই এই সিনেমাটিকেও আমি রেটিং দিতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় আন্তর্জাতিক বোদ্ধারা বোধহয় এরকম সিনেমাকেই ফুল স্টার দিয়ে থাকে। সিনেমাটি দেখে যে উচ্ছ্বাস নিয়ে, যে তৃপ্তি নিয়ে হল থেকে বেরিয়েছি, হয়ত সেই আবেগেই কথাটা বলে ফেললাম।

হৃদি হকের পরবর্তী সিনেমার অপেক্ষায় থাকবো।

জয় হোক বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের।


লেখক সম্পর্কে বিস্তারিত

নির্মাতা, লেখক ও উদ্যোক্তা .... “নিজের টাকায় টিকিট কেটে সিনেমার দেখি অধিকার নিয়ে দেই তালি বা গালি”

মন্তব্য করুন